উক্রেনের রাষ্ট্রপতি জেলেনস্কি মঙ্গলবার খারকিভ অঞ্চলে একটি যাত্রীবাহী ট্রেনে রাশিয়া সরকারের ড্রোন আক্রমণকে “সন্ত্রাসবাদ” বলে নিন্দা করেন। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের মতে, আক্রমণে কমপক্ষে চারজনের মৃত্যু হয়েছে এবং আরও চারজন নিখোঁজ। ট্রেনে ২০০েরও বেশি যাত্রী ছিল।
আক্রমণটি খারকিভের যাযিকোভে গ্রাম নিকটবর্তী স্থানে ঘটেছে, যেখানে একটি ড্রোন সরাসরি একটি ডিবি (কারেজ)‑এ আঘাত হানে এবং অতিরিক্ত দুইটি ড্রোন ট্রেনের কাছাকাছি বিস্ফোরিত হয়। ধ্বংসপ্রাপ্ত ডিবি এখনও জ্বলতে থাকে, যা স্থানীয় জরুরি সেবা কর্তৃক প্রকাশিত ছবি ও ভিডিওতে দেখা যায়।
স্থানীয় প্রাদেশিক প্রসিকিউটর অফিসের তথ্য অনুযায়ী, আঘাতপ্রাপ্ত ডিবিতে ১৮জন যাত্রী ছিলেন। চারজনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে, আর চারজনের অবস্থান এখনও অজানা।
জেলেনস্কি মঙ্গলবার রাতের দিকে সামাজিক মাধ্যমে একটি পোস্টে লিখে জানান, “যেকোনো দেশে নাগরিক ট্রেনে ড্রোন আক্রমণকে সন্ত্রাসবাদ হিসেবে গণ্য করা হবে” এবং এ ধরনের হামলার কোনো সামরিক যুক্তি নেই বলে উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন, লক্ষ্যবস্তু ছিল সম্পূর্ণ বেসামরিক গন্তব্য।
একই রাতে, উক্রেনের দক্ষিণের ওডেসা বন্দরেও রাশিয়া সরকারের ড্রোনের আক্রমণ ঘটে। ৫০টিরও বেশি ড্রোন শহরের জ্বালানি ও অন্যান্য নাগরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে, যার ফলে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।
ভ্লাদিমির পুতিনের নেতৃত্বাধীন রাশিয়া সরকার এই ঘটনাগুলোর বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাশিয়া সরকার উক্রেনের জ্বালানি ও পরিবহন নেটওয়ার্কে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার বাড়িয়ে তুলেছে।
শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ লক্ষ উক্রেনীয় নাগরিক তাপ, বিদ্যুৎ ও পানির সংকটে ভুগছে। রাশিয়া সরকারের আক্রমণগুলো দেশের মৌলিক সেবা সরবরাহে বড় ধাক্কা দিচ্ছে।
ভ্লাদিমির পুতিন ফেব্রুয়ারি ২০২২-এ পূর্ণমাত্রায় আক্রমণ শুরু করেন, এবং রাশিয়া সরকার বর্তমানে উক্রেনের প্রায় ২০% ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এই আক্রমণগুলো যুদ্ধের বিস্তৃতি ও তীব্রতা নির্দেশ করে।
নাটো সদস্য দেশগুলো ট্রেনের ওপর আক্রমণকে কঠোরভাবে নিন্দা করে এবং রাশিয়া সরকারকে বেসামরিক লক্ষ্যবস্তু আক্রমণ বন্ধ করতে আহ্বান জানায়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিতে এই ধরনের হামলা যুদ্ধের নৈতিক সীমা লঙ্ঘন করে।
একজন ইউরোপীয় কূটনৈতিক সূত্র উল্লেখ করেন, “এই ধরনের সরাসরি বেসামরিক আক্রমণ রাশিয়া সরকারের উপর অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞা আরোপের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলবে এবং চলমান শান্তি আলোচনার জটিলতা বৃদ্ধি করবে।” তার মতে, আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দায়িত্বশীলদের জবাবদিহি করা জরুরি।
বিশ্লেষকরা বলেন, রাশিয়া সরকার বেসামরিক ও সামরিক উভয়ই ব্যবহারকারী পরিবহন লাইনকে লক্ষ্য করে চলেছে, যা উক্রেনের চলাচল ও মনোবলকে ব্যাহত করার কৌশল হিসেবে দেখা যায়। ট্রেনের মতো জনপরিবহনকে আঘাত করা যুদ্ধের সামগ্রিক চাপ বাড়ায়।
উক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ আক্রমণের পূর্ণ তদন্তের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক আদালতে রাশিয়া সরকারের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। এই পদক্ষেপগুলো ভবিষ্যতে অনুরূপ আক্রমণ রোধে সহায়তা করবে।
উক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সতর্ক করেছে যে শীতের কঠিন পরিস্থিতি শেষ না হওয়া পর্যন্ত রাশিয়া সরকারের ড্রোন কার্যক্রম বাড়তে পারে। তারা দেশের বেসামরিক অবকাঠামো রক্ষার জন্য অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সারসংক্ষেপে, খারকিভে ট্রেনের ওপর ড্রোন আক্রমণ এবং ওডেসা বন্দরকে লক্ষ্য করে একাধিক ড্রোনের ব্যবহার উভয়ই রাশিয়া সরকারের সামরিক কৌশলের তীব্রতা বাড়িয়ে তুলেছে। এই ঘটনা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বেসামরিক সুরক্ষার গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করতে এবং দ্রুত কূটনৈতিক সমাধানের দিকে অগ্রসর হতে উদ্বুদ্ধ করছে।



