ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সির (ESA) দুইজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী হাবল টেলিস্কোপের বিশাল ডেটা বিশ্লেষণে নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সিস্টেম ব্যবহার করে দুই‑দশ দিনেই ৮০০‑এর বেশি অজানা মহাজাগতিক অস্বাভাবিকতা সনাক্ত করেছেন। এই গবেষণায় হাবলের ৩৫ বছরের ইতিহাসের ডেটা, হাবল লিগেসি আর্কাইভের দশ‑হাজারেরও বেশি ডেটাসেট, বিশ্লেষণের মূল বস্তু ছিল।
ডেভিড ও’রায়ান এবং পাব্লো গোমেজ নামের দুই বিজ্ঞানী একটি নিউরাল নেটওয়ার্ক তৈরি করেন, যার নাম তারা AnomalyMatch রেখেছেন। এই সিস্টেমটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছবির ছোট অংশগুলো স্ক্যান করে অস্বাভাবিক প্যাটার্ন শনাক্ত করার জন্য প্রশিক্ষিত। মেশিনটি হাবল থেকে প্রাপ্ত প্রায় একশো মিলিয়ন ছবির টুকরা বিশ্লেষণ করতে সক্ষম, যা মানব বিশেষজ্ঞদের হাতে করা কাজের চেয়ে অনেক বেশি।
প্রায় দুই দিন অর্ধেক সময়ে AnomalyMatch প্রায় একশো মিলিয়ন ছবির টুকরা পর্যালোচনা করে ১,৪০০টি সম্ভাব্য অস্বাভাবিক বস্তু তালিকাভুক্ত করে। এই প্রাথমিক তালিকায় বিভিন্ন ধরণের গ্যালাক্সি, নক্ষত্রমণ্ডল এবং আলো বিকৃতি অন্তর্ভুক্ত ছিল, তবে এখনও চূড়ান্ত নিশ্চিতকরণ প্রয়োজন ছিল।
বিষয়টি চূড়ান্তভাবে নির্ধারণের জন্য বিজ্ঞানীরা নিজ হাতে সব প্রার্থীদের পর্যালোচনা করেন। মানব চোখের যাচাইয়ের পর ১,৪০০টি প্রার্থীর মধ্যে ৮০০টির বেশি পূর্বে কোনো গবেষণায় উল্লেখ না করা বস্তু হিসেবে নিশ্চিত হয়। এই সংখ্যা হাবল ডেটার বিশাল পরিমাণের মধ্যে নতুন আবিষ্কারের সম্ভাবনা প্রকাশ করে।
অনেকগুলো অস্বাভাবিক বস্তু গ্যালাক্সির পারস্পরিক ক্রিয়া বা মিশ্রণের ফলে গঠিত, যার ফলে অদ্ভুত আকৃতি, দীর্ঘ তারার লেজ বা গ্যাসের ধারা দেখা যায়। এই ধরনের গ্যালাক্সি মিশ্রণ মহাবিশ্বের গঠন প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়।
অন্যান্য আবিষ্কারের মধ্যে রয়েছে মহাকর্ষীয় লেন্স, যেখানে সামনের গ্যালাক্সির ভর সময়-স্থানকে বাঁকিয়ে পেছনের গ্যালাক্সির আলোকে বৃত্ত বা ধনুকের আকারে পরিবর্তন করে। এই প্রাকৃতিক টেলিস্কোপের মাধ্যমে দূরবর্তী মহাবিশ্বের গঠন সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়া যায়।
কিছু বস্তু হল প্রোটো-প্ল্যানেটের গঠনকারী ডিস্ক, যা প্রান্ত থেকে দেখা হলে পাতলা রেখা হিসেবে প্রকাশ পায়। এই ধরনের ডিস্কের পর্যবেক্ষণ গ্রহ গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ের সরাসরি প্রমাণ সরবরাহ করে।
বৃহৎ তারকাখণ্ডযুক্ত গ্যালাক্সি, যেখানে একক বৃহৎ তারকাখণ্ড গ্যালাক্সির কেন্দ্রে ঘনত্বে জমা হয়েছে, সেগুলিও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। এই গ্যালাক্সিগুলি দ্রুত তারকা গঠন এবং বিকাশের প্রক্রিয়া নির্দেশ করে।
জেলিফিশ গ্যালাক্সি, অর্থাৎ এমন গ্যালাক্সি যেখানে গ্যাসের প্রবাহ গ্যালাক্সির কেন্দ্র থেকে দূরে বেরিয়ে যায়, সেগুলিও শনাক্ত হয়েছে। এই গ্যাসীয় প্রবাহ গ্যালাক্সির পরিবেশে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
অতিরিক্তভাবে, গবেষকরা কয়েক ডজন এমন বস্তুও পেয়েছেন, যেগুলি প্রচলিত শ্রেণীবিভাগে ফিট করে না এবং নতুন তত্ত্বের প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে। এই অজানা বস্তুগুলি ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য আকর্ষণীয় লক্ষ্য হতে পারে।
এই ফলাফল দেখায় যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশাল আকাশীয় ডেটা থেকে দ্রুত এবং কার্যকরভাবে নতুন বৈজ্ঞানিক তথ্য বের করতে পারে, যেখানে মানব বিশ্লেষকের কাজের পরিমাণ সীমিত। মেশিনের দ্রুত স্ক্যানিং ক্ষমতা এবং মানবের সূক্ষ্ম বিচার একসাথে কাজ করে গবেষণার উৎপাদনশীলতা বাড়ায়।
গবেষকরা উল্লেখ করেন, হাবল আর্কাইভের মতো বিশাল ডেটাসেটের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে AI টুলের ভূমিকা অপরিহার্য। এত বড় ডেটা ভাণ্ডার থেকে এত বেশি অস্বাভাবিক বস্তু বের হওয়া প্রত্যাশার চেয়েও বেশি ফলাফল, যা ভবিষ্যৎ মহাকাশ গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
এ ধরনের পদ্ধতি কেবল হাবল নয়, অন্যান্য বড় টেলিস্কোপের ডেটা, যেমন জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের ছবি, বিশ্লেষণে প্রয়োগ করা যেতে পারে। বৃহৎ স্কেলে ডেটা প্রক্রিয়াকরণে AI এর ব্যবহার বিজ্ঞানী সম্প্রদায়ের কাজের গতি এবং গুণমান উভয়ই বৃদ্ধি করবে।
সারসংক্ষেপে, AI-ভিত্তিক AnomalyMatch হাবল ডেটার বিশাল পরিমাণ থেকে নতুন, অপ্রত্যাশিত মহাজাগতিক ঘটনা উন্মোচন করেছে, যা ভবিষ্যৎ গবেষণার দিকনির্দেশনা নির্ধারণে সহায়ক হতে পারে। আপনি কি মনে করেন, এই ধরনের স্বয়ংক্রিয় বিশ্লেষণ ভবিষ্যতে মহাবিশ্বের গোপন রহস্য উন্মোচনে প্রধান হাতিয়ার হবে?



