তেজগাঁওতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সংস্থার (বিআরটিসি) প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে মঙ্গলবার একটি সভায় উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান সরকারি কর্মীদের স্বার্থপরতা ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, সরকারি কর্মকর্তারা নিজেদের সুবিধা, বেতন বৃদ্ধি এবং দুর্নীতির সুযোগকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন, আর সাধারণ জনগণের সমস্যার প্রতি তাদের কোনো মনোযোগ নেই।
উপদেষ্টা ফাওজুল কবিরের মন্তব্যের মূল অংশে তিনি বলেন, “তারা (সরকারি কর্মকর্তা) চান তাদের সুযোগ-সুবিধা, পে স্কেল বাড়াতে হবে, তাদের দুর্নীতির সুযোগ বাড়াতে হবে। কিন্তু সাধারণ মানুষ গোল্লায় যাক, এটা নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি সরকারি দপ্তরের কাজের অকার্যকারিতা ও নাগরিকদের প্রতি অবহেলা তুলে ধরেছেন।
ফাওজুল কবির, যিনি পূর্বে বাংলাদেশ সরকারের সচিব পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন, অতিরিক্তভাবে মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজে ঘটিত বিমান দুর্ঘটনা সম্পর্কেও মন্তব্য করেন। তিনি জানান, “আমাকে একজন বলেছিল যে মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজে যে বিমান দুর্ঘটনা হয়েছে- এই বিমানটি মাইলস্টোনে না পড়ে সচিবালয়ের ওপরে পড়া উচিত ছিল। মানুষ এত ক্ষুব্ধ। শুধু সচিবালয় নয়, সরকারি প্রতিটি দপ্তরের ওপর জনগণ অনেক ক্ষুব্ধ।” এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, জনগণ সরকারের প্রতিটি স্তরে অবহেলার কারণে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ প্রকাশ করছে।
বিবিধ দপ্তরে কাজের অগ্রগতি না হওয়ায় ফাওজুল কবিরের অভিযোগ তীব্র হয়। তিনি বলেন, “সবাই অফিসে আসেন-যান, গাড়িতে চড়েন। কিন্তু মানুষের জীবনের যে দৈনন্দিন সমস্যা, সেই বিষয়ে তাদের কোনো ইয়ে নেই। তারা শুধু চিঠি চালাচালি করেন। এই রুম থেকে ওই রুমে চিঠি যায়। সভা হয়, সমিতি হয়, লাঞ্চ হয়, স্ন্যাকস হয়, কিন্তু কাজের কাজটা কিছুই হয় না। যত কিছুই করার চেষ্টা করেছি, সবকিছুই আটকে আছে।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি সরকারি কর্মীদের দৈনন্দিন রুটিনকে অপ্রয়োজনীয় ব্যয়বহুল কার্যক্রম হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
সড়ক নীতিমালা সংক্রান্ত তার অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “সড়কের নীতিমালা আমি নিজে বসে ব্ল্যাকবোর্ডে দেখিয়ে সবকিছু বলে দিয়েছি যে এটা করতে হবে, ওটা করতে হবে। কিন্তু এখনো হচ্ছে না। কারণ তারা (কর্মকর্তারা) এর পরিবর্তন চান না।” তিনি উল্লেখ করেন, নীতিমালা বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করা অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধই মূল সমস্যা।
ফাওজুল কবিরের মতে, আমলাতন্ত্রের অবস্থা এক প্রাচীন পাথরের মতো স্থির হয়ে গেছে, যা জনগণের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং কার্যকর পদক্ষেপের পথ বন্ধ করে। তিনি উল্লেখ করেন, “আমলাতন্ত্র একটি জগদ্দল পাথরের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা জনগণের বুকে চেপে বসে আছে। কিছুই করা যায় না এখানে। কোনো রকম মানবিক দায়িত্ববোধ আমাদের এই আমলাতন্ত্রে নেই।” এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, তিনি আমলাতন্ত্রকে দেশের উন্নয়নের প্রধান বাধা হিসেবে দেখছেন।
উপদেষ্টা আরও উল্লেখ করেন, “এর কারণ হচ্ছে আমাদের আমলাতন্ত্র। আমলাতন্ত্রই আমাদের পিছিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ভাগ্য উন্নয়নে প্রধান প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সরকারের মেয়াদ আছে আর ১৫ দিন। আমরা তো চলে যাব। কিন্তু সমস্যাগুলো তো যাবে না। সমস্যার সমাধান তো করতেই হবে।” তিনি বর্তমান সরকারী মেয়াদের শেষের দিকে থাকা সময়সীমা উল্লেখ করে, সমস্যার সমাধানের জরুরি প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন।
ফাওজুল কবিরের এই মন্তব্যগুলো সরকারী দপ্তরের কার্যকারিতা, নীতি বাস্তবায়ন এবং জনসাধারণের সঙ্গে সংলাপের ঘাটতি সম্পর্কে একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে। তার বক্তব্যের ভিত্তিতে, সরকারী কর্মকর্তাদের কাজের পদ্ধতি পুনর্বিবেচনা এবং নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা মেটাতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে ধারণা করা যায়।
এই সমালোচনা সরকারের ভবিষ্যৎ নীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষত যখন সরকারী দপ্তরের কার্যকরী কাঠামো ও দায়িত্ববোধের পুনর্গঠন নিয়ে আলোচনা বাড়বে। জনমত গঠনে এই ধরনের উন্মুক্ত সমালোচনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, যা পরবর্তী সময়ে নীতি সংশোধন ও প্রশাসনিক সংস্কারের ভিত্তি হতে পারে।



