বাংলাদেশ এই বছর শেষে সর্বনিম্ন উন্নত দেশ (এলডিসি) তালিকা থেকে বেরিয়ে আসবে, তবে ব্যবসা ও ব্যাংকিং ক্ষেত্রের নেতারা সতর্ক করেছেন যে প্রস্তুতির ঘাটতি অর্থনীতিতে গুরুতর ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। আন্তর্জাতিক চেম্বার অফ কমার্স‑বাংলাদেশ (আইসিসিবি) দ্বারা আয়োজিত একটি রাউন্ডটেবিল আলোচনায় এই বিষয়টি বিশদভাবে তুলে ধরা হয়।
রাউন্ডটেবিলে অংশগ্রহণকারী ব্যাংকিং কর্মকর্তারা উল্লেখ করেন, গ্র্যাজুয়েশনের পর ধীরে ধীরে বাংলাদেশকে পছন্দসই বাজার প্রবেশাধিকার, অনুদানমূলক ঋণ এবং নীতি নমনীয়তা হারাতে হবে। এই সুবিধাগুলোর হ্রাস আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা তীব্র করবে, রপ্তানির ওপর চাপ বাড়াবে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়াবে।
আইসিসিবি সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, এই পরিবর্তনগুলো দেশের আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নতুন চ্যালেঞ্জ আরোপ করবে এবং গ্র্যাজুয়েশনকে কেবল একটি প্রতীকী মাইলফলক নয়, বরং গঠনমূলক পরিবর্তন হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। তিনি জোর দিয়ে বলেন, পোস্ট‑এলডিসি সময়ে একটি শক্তিশালী, স্বতন্ত্র এবং বিশ্বাসযোগ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর্থিক স্থিতিশীলতা ও বাজারের আস্থা বজায় রাখার মূল স্তম্ভ হবে।
আইসিসিবি উপ-সভাপতি এ.কে. আজাদ উল্লেখ করেন, গ্র্যাজুয়েশনের পর রপ্তানি ও অন্যান্য সেক্টরে স্পষ্ট প্রভাব পড়বে। তিনি বলেন, এই প্রভাবগুলো ইন্টারিম সরকারকে উপস্থাপন করা হয়েছিল, তবে তা গ্রহণ করা হয়নি। ভবিষ্যৎ সরকারকে এই বিষয়টি ত্বরান্বিতভাবে সমাধান করতে হবে, কারণ বাস্তবিক প্রস্তুতি ও সমন্বয় সময়সাপেক্ষ।
ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন রহমান গ্র্যাজুয়েশনকে নীতি স্থান ও প্রতিযোগিতার কাঠামো পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে দেখেন। তিনি বিশেষভাবে ঔষধ শিল্পের ওপর গুরুত্বারোপ করেন, যেখানে সমন্বিত নীতি, কার্যকর নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা, আর্থিক সহায়তা এবং পর্যাপ্ত রূপান্তর সময়ের প্রয়োজন।
সিমিনের মতে, দেশের সক্রিয় ফার্মাসিউটিক্যাল উপাদান (এপিআই) উৎপাদন বাড়ানো এই রূপান্তরের অন্যতম মূল পদক্ষেপ। স্থানীয়ভাবে এপিআই উৎপাদন বাড়ালে রপ্তানি সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার ক্ষমতা বজায় থাকবে।
তিনি আরও বলেন, যদি স্বাস্থ্য, শিল্প শক্তি এবং আর্থিক স্থিতিশীলতাকে রূপান্তরের কেন্দ্রে রাখা হয়, তবে বাংলাদেশ সফলভাবে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করতে পারবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে নীতি প্রণেতা, শিল্প সংস্থা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত কাজ প্রয়োজন।
গ্র্যাজুয়েশন প্রক্রিয়ার সময় বাংলাদেশকে পছন্দসই বাণিজ্যিক চুক্তি, কম সুদের ঋণ এবং বিশেষ আর্থিক সুবিধা ধীরে ধীরে হারাতে হবে, যা পূর্বে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও উন্নয়ন ব্যাংক থেকে পাওয়া যেত। এই সুবিধাগুলোর হ্রাসের ফলে রপ্তানির মূল্যে চাপ বাড়বে এবং দেশীয় উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে।
ব্যাংকিং সেক্টরের দৃষ্টিকোণ থেকে, ঋণগ্রহীতাদের জন্য ক্রেডিটের শর্ত কঠোর হতে পারে, আর আর্থিক বাজারে তরলতা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে ঋণগ্রহীতা ও বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকি বাড়বে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ধীর করতে পারে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন, গ্র্যাজুয়েশনের পর প্রথম দুই থেকে তিন বছর পর্যন্ত অর্থনীতির গতি ধীর হতে পারে, তবে সঠিক নীতি সমন্বয় ও কাঠামোগত সংস্কার দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়নের গতি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।
সারসংক্ষেপে, ব্যবসা ও ব্যাংকিং নেতারা একমত যে গ্র্যাজুয়েশন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন, যার জন্য সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে, নীতি প্রণয়নে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে এবং শিল্পখাতে পর্যাপ্ত সমর্থন নিশ্চিত করতে হবে। এভাবে দেশটি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান বজায় রেখে টেকসই উন্নয়নের পথে অগ্রসর হতে পারবে।



