বিধানসভা ও মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান ২৭ জানুয়ারি মঙ্গলবার তেজগাঁওয়ের বিআরটিসি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়ে সরকারি দপ্তরগুলোর আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও কর্মকর্তাদের আচরণ সম্পর্কে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে বর্তমান আমলাতন্ত্র দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে এবং সাধারণ মানুষের মৌলিক সমস্যার সমাধানে বাধা সৃষ্টি করছে।
এই বক্তব্যের সময় শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও অংশীদারিত্বমূলক প্রকল্পের আওতায় পেশাজীবী চালক ও শ্রমিকদের জন্য সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের উদ্বোধনও অনুষ্ঠিত হয়। ফাওজুল কবির খান প্রধান অতিথি হিসেবে সমাবেশের উদ্বোধনী ভাষণ দেন এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
উপদেষ্টা আমলাতন্ত্রের অদক্ষতা নিয়ে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করে বলেন, সরকারি দপ্তরগুলোর কাজের ধরণ জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি উল্লেখ করেন যে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মধ্যে বিশাল ফাঁক রয়েছে, যা দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করছে।
ফাওজুল কবির খান সম্প্রতি উত্তরে মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজের কাছে ঘটিত বিমান দুর্ঘটনার কথা উল্লেখ করে বলেন, “যদি বিমানটি মাইলস্টোনে না গিয়ে সচিবালয়ে হতো, তবে জনগণের ক্ষোভের মূল কারণটি অন্য দিকে সরিয়ে যেত।” তিনি এই মন্তব্যের মাধ্যমে সরকারি দপ্তরগুলোর প্রতি জনমতের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষকে তুলে ধরেন।
উল্লেখযোগ্য যে, মাইলস্টোন দুর্ঘটনা ঘটার পর থেকে সচিবালয় ও অন্যান্য সরকারি দপ্তরগুলোতে জনসাধারণের মধ্যে ব্যাপক রাগের স্রোত দেখা দিয়েছে। ফাওজুল কবির খান বলেন, “সচিবালয় নয়, সব সরকারি দপ্তরে মানুষ ক্রমশ বেশি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে।” তিনি এই ক্ষোভের মূল কারণকে আমলাতন্ত্রের অদক্ষতা ও দায়িত্বহীনতার সঙ্গে যুক্ত করেন।
উপদেষ্টা আমলাতন্ত্রকে “জগদ্দল পাথর” হিসেবে উপমা দিয়ে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, “এটি জনগণের বুকে চেপে বসে আছে, কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।” এই উপমা দিয়ে তিনি আমলাতন্ত্রের অপ্রতিদ্বন্দ্বিতার অবস্থা ও তার ফলে সৃষ্ট সামাজিক অশান্তি প্রকাশ করেন।
কর্মকর্তাদের দৈনন্দিন কাজের ধরণ নিয়ে তিনি সমালোচনা করেন, “বেশিরভাগ কর্মকর্তা অফিসে আসেন, যান, গাড়িতে চড়েন, কিন্তু মানুষের মৌলিক সমস্যার সমাধানে তাদের কোনো দায়িত্ববোধ নেই।” তিনি উল্লেখ করেন, সরকারি কর্মীরা প্রায়ই চিঠি চালাচালি ও সভায় অংশগ্রহণে ব্যস্ত থাকেন, তবে বাস্তব কাজের ফলাফল দেখা যায় না।
ফাওজুল কবির খান জানান, তিনি নিজে বিভিন্ন নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছেন, তবে তার প্রচেষ্টা প্রায়শই আমলাতন্ত্রের বাধার কারণে থেমে গেছে। তিনি বলেন, “আমি যতই চেষ্টা করি, সবকিছুই আটকে থাকে।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি সরকারি ব্যবস্থার অদক্ষতা ও পরিবর্তনের অভাবকে তুলে ধরেন।
সড়ক পরিবহন খাতের সংস্কার নিয়ে তিনি নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। তিনি বলেন, “সড়কের নীতিমালা আমি নিজে ব্ল্যাকবোর্ডে বসে বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছি, কিন্তু বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি।” তিনি উল্লেখ করেন যে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পরিবর্তনের পরিবর্তে নিজেদের সুবিধা ও পে-স্কেল বাড়ানোর দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন।
উপদেষ্টা আরও জানান, কিছু কর্মকর্তার মধ্যে দুর্নীতির সুযোগ বাড়ানোর ইচ্ছা রয়েছে, যা সাধারণ জনগণের ক্ষতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তিনি বলেন, “তারা নিজেদের স্বার্থে সুযোগ-সুবিধা চান, আর সাধারণ মানুষকে গলিতে ঠেলে দেয়া হয়।” এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি সরকারি দপ্তরের মধ্যে বিদ্যমান স্বার্থপরতা ও দুর্নীতির সমস্যাকে প্রকাশ করেন।
ফাওজুল কবির খান সরকারি কর্মচারীদের সতর্ক করে বলেন, “সরকারি কর্মচারী জনগণের সেবক, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের কাজের মান ও দায়িত্ববোধ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে।” তিনি কর্মচারীদের নৈতিক দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রত্যাশা করেন যে তারা জনগণের স্বার্থে কাজ করবে।
এই সমালোচনামূলক বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মন্তব্য করছেন যে, উপদেষ্টার এই প্রকাশনা সরকারে আমলাতন্ত্রের সংস্কার নিয়ে আলোচনার তীব্রতা বাড়াতে পারে। তারা অনুমান করছেন যে, ভবিষ্যতে বাংলাদেশ সরকারকে এই সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য কাঠামোগত পরিবর্তন করতে হবে।
সারসংক্ষেপে, ফাওজুল কবিরের তেজগাঁওতে করা বক্তব্যে আমলাতন্ত্রের অদক্ষতা, সরকারি দপ্তরের প্রতি জনমতের ক্ষোভ এবং সড়ক নীতিমালার বাস্তবায়নের সমস্যাগুলো স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে। তার মন্তব্য সরকারকে এই বিষয়গুলোতে ত্বরান্বিত পদক্ষেপ নিতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে, যা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।



