ইউকেই যুক্তরাজ্য তার মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য নতুন ১.৪ মিলিয়ন ডলার তহবিল অনুমোদন করেছে। এই তহবিল পূর্বে ২০২৫ সালে বিশ্বখাদ্যপ্রোগ্রাম (WFP) এর মাধ্যমে বরাদ্দ করা ১১.৬ মিলিয়ন ডলারের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে এবং সরাসরি WFP এর ই‑ভাউচার সিস্টেমের মাধ্যমে বিতরণ করা হবে।
কক্সবাজারের আশেপাশে অবস্থিত শরণার্থী ক্যাম্পে বর্তমানে প্রায় ১.২ মিলিয়ন রোহিঙ্গা বসবাস করছেন, যাদের খাদ্য নিরাপত্তা ও মৌলিক সেবার প্রয়োজন ক্রমশ বাড়ছে। যুক্তরাজ্যের এই অতিরিক্ত তহবিলের লক্ষ্য হল শরণার্থী পরিবারগুলোকে পুষ্টিকর খাবার ও অপরিহার্য সেবা নিশ্চিত করা, যাতে তারা মৌলিক জীবনের মান বজায় রাখতে পারে।
ব্রিটিশ উপদূত জেমস গোল্ডম্যান, যিনি বাংলাদেশে ব্রিটিশ হাই কমিশনের উন্নয়ন পরিচালকও, এই সহায়তা সম্পর্কে গর্ব প্রকাশ করে বলেন, যুক্তরাজ্য WFP এর গুরুত্বপূর্ণ কাজকে অব্যাহতভাবে সমর্থন করতে প্রস্তুত, যাতে শরণার্থী পরিবারগুলো সুষম আহার পেতে পারে এবং স্থানীয় সরবরাহকারীদের কাছ থেকে পণ্য ক্রয় করে অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এই তহবিলের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল এর স্থানীয় ক্রয় প্রণালী। যুক্তরাজ্য সরবরাহিত অর্থের একটি অংশ সরাসরি বাংলাদেশী বিক্রেতা ও উৎপাদকদের কাছ থেকে পণ্য ক্রয়ের জন্য ব্যবহার করা হবে, ফলে শরণার্থী ক্যাম্পের আশেপাশের হোস্ট কমিউনিটিগুলোর অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়নে সহায়তা হবে।
WFP এর ই‑ভাউচার সিস্টেমের মাধ্যমে শরণার্থী পরিবারগুলোকে প্রতি ব্যক্তি মাসে ১২ ডলার ভাউচার প্রদান করা হবে, যা তারা স্ট্যাপল এবং তাজা খাবার কেনার জন্য ব্যবহার করতে পারবে। এই পদ্ধতি সুবিধাভোগীদের পছন্দের খাবার বাছাই করার স্বাধীনতা দেয় এবং বাজারে সরবরাহের বৈচিত্র্য বজায় রাখে।
খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি, WFP শিশু ও গর্ভবতী, স্তন্যদানকারী নারীদের জন্য পুষ্টি সহায়তা প্রদান করে। পাঁচ বছরের নিচের শিশুরা ও গর্ভবতী নারীদের জন্য বিশেষ পুষ্টিকর খাবার সরবরাহের মাধ্যমে মারাত্মক পুষ্টিহীনতা রোধ করা এবং ইতিমধ্যে আক্রান্তদের চিকিৎসা করা হয়।
শিক্ষা ও পুষ্টির সমন্বয় লক্ষ্যে, ক্যাম্পের ৩ থেকে ১৪ বছর বয়সী প্রায় ২৬ লক্ষ রোহিঙ্গা শিশুর জন্য স্কুল মেলাময় খাবার সরবরাহ করা হয়। এই উদ্যোগটি শিক্ষায় উপস্থিতি বাড়াতে এবং শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সহায়তা করে।
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বাড়ানোর জন্য, WFP জীবিকাভিত্তিক হস্তক্ষেপ চালু করেছে, যা রোহিঙ্গা ও হোস্ট কমিউনিটির সদস্যদের জন্য আয় সৃষ্টির সুযোগ তৈরি করে। ক্ষুদ্র ব্যবসা, কৃষি ও হস্তশিল্পের প্রশিক্ষণ ও সমর্থনের মাধ্যমে শরণার্থীদের স্বনির্ভরতা বাড়ানো লক্ষ্য।
WFP দেশের পরিচালক সিমোন পার্চমেন্ট এই তহবিলের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, যুক্তরাজ্যের ধারাবাহিক সমর্থন রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মৌলিক চাহিদা পূরণে অপরিহার্য, বিশেষ করে যখন মানবিক তহবিলের প্রবাহ কমছে এবং চাহিদা বাড়ছে। তিনি উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সংহতি রোহিঙ্গা মত দুর্বল গোষ্ঠীর বেঁচে থাকা নিশ্চিত করার মূল চাবিকাঠি।
রোহিঙ্গা সংকট এখন নবম বছর পার করেছে, এবং তহবিলের তীব্র হ্রাসের ফলে সহায়তার ধারাবাহিকতা ঝুঁকির মুখে। এই সময়ে আন্তর্জাতিক দাতাদের অবদান ও সমন্বিত কূটনৈতিক প্রচেষ্টা শরণার্থীদের মৌলিক অধিকার রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
যুক্তরাজ্যের এই নতুন তহবিলকে অন্যান্য দাতা দেশের অবদানসহ একটি বৃহত্তর আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখা হয়, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও মানবিক দায়িত্বের প্রতি প্রতিশ্রুতি প্রকাশ করে। কূটনৈতিক স্তরে, এই ধরনের আর্থিক সহায়তা দু’দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে শক্তিশালী করে এবং মানবিক নীতির বাস্তবায়নে সহায়তা করে।
ভবিষ্যতে, যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ তহবিলের ব্যবহার, বিতরণ প্রক্রিয়া ও প্রভাবের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাবে, যাতে শরণার্থী ক্যাম্পে খাদ্য নিরাপত্তা ও জীবিকাভিত্তিক প্রকল্পের পরবর্তী মাইলস্টোন নির্ধারিত হয় এবং প্রয়োজনীয় সমর্থন সময়মতো পৌঁছাতে পারে।



