শফিকুর রহমান, জামায়াত-এ-ইসলামি আমির, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বাগেরহাটের হজরত খানজাহান (রহ.) মাজার‑সংলগ্ন মাঠে অনুষ্ঠিত নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হন। অনুষ্ঠানে তিনি পার্টির চারটি আসনের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে দলীয় প্রতীক দাঁড়িপাল্লা তুলে দেন। উপস্থিত ভক্ত ও স্থানীয় নেতারা তার বক্তৃতা শোনার জন্য বিশাল ভিড় গঠন করে ছিলেন।
বক্তব্যের শুরুতে শফিকুর রহমান জোর দিয়ে বললেন, রাজনীতির স্বচ্ছতা সমাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে। তিনি যুক্তি দেন, শীর্ষে যদি সঠিক মানসিকতা থাকে, তবে পুরো দেশের শাসন‑ব্যবস্থা সুষ্ঠু হবে এবং দুর্নীতির কোনো সুযোগ থাকবে না। এ ধারনা তিনি ‘মাথা ঠিক থাকলে শরীর ঠিক হবে’ এমন রূপক দিয়ে প্রকাশ করেন।
এরপর তিনি ‘লেজ টানব না, কান টানব না’ বলে কোনো অপরাধীকে অব্যাহত রাখার সুযোগ না দেওয়ার সংকল্প প্রকাশ করেন। তিনি স্পষ্ট করে জানান, যারা কোনো অপরাধ করবে তাদের জন্য কোনো ছাড় থাকবে না এবং আইন‑শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই প্রতিশ্রুতি তিনি ‘ইনশা আল্লাহ’ শব্দ দিয়ে সমাপ্ত করেন।
প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর শফিকুর রহমান পরিবার‑কার্ড বিতরণ ও শারীরিক হুমকির মধ্যে বৈপরীত্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, মায়েদের হাতে পরিবার‑কার্ড দিলে একই সঙ্গে তাদের গায়ে হাত দেওয়া দু’টি কাজ একসাথে চলতে পারে না। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি পার্টির নীতি ও আচরণে সামঞ্জস্যের দাবি করেন।
শফিকুর রহমান জোর দিয়ে বলেন, জামায়াত-এ-ইসলামি একমাত্র শাসনকারী হওয়া বাধ্যতামূলক নয়, তবে দেশের সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি যুক্তি দেন, যারা দেশের প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসা রাখে, তাদেরই শাসনের দায়িত্ব দেওয়া উচিত। তিনি পৈতৃক বা জমিদার ভিত্তিক রাজনীতিকে অগ্রাহ্য করে, জনগণের স্বার্থে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
বক্তব্যের মধ্যে তিনি ব্যাংক ডাকাত এবং শেয়ার বাজারের লুটেরদের প্রশ্ন তুলেন। শফিকুর রহমান উল্লেখ করেন, অনেকেই বিদেশে পালিয়ে গিয়ে সম্পদ সঞ্চয় করেছে, তবে আল্লাহর তৌফিকে তারা দেশের তহবিলে ফিরে আসবে। তিনি দাবি করেন, এই অর্থ পুনরুদ্ধার করে রাষ্ট্রের তহবিলে যোগ করা হবে।
জনসভায় তিনি কিছু নারী কর্মীর হিজাব ও নেকাব খুলে ফেলতে চাওয়া দাবি নিয়ে সমালোচনা করেন। শফিকুর রহমান বলেন, এমন দাবি গণতন্ত্রের বিপরীত এবং নির্বাচনের আগে এই ধরনের আচরণ স্বাভাবিক নয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, নির্বাচনের পরেও দেশের নীতি ও সংস্কার বজায় থাকবে।
বহিরাগত সম্পর্কের বিষয়ে তিনি বললেন, বাংলাদেশকে সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, আধিপত্য নয়। শফিকুর রহমান অতীতের আধিপত্যবাদী নীতিগুলোকে প্রত্যাখ্যান করে, দেশের স্বায়ত্তশাসন ও মর্যাদা রক্ষার আহ্বান জানান।
বিপক্ষের কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং সিভিল সোসাইটি গোষ্ঠী শফিকুর রাহমানের বক্তব্যকে র্যাডিকাল ও জনমুখী বলে সমালোচনা করেন। তারা যুক্তি দেন, নির্বাচনের আগে এ ধরনের প্রতিশ্রুতি ভোটারকে প্রভাবিত করার প্রচেষ্টা এবং বাস্তবায়নের জন্য স্পষ্ট পরিকল্পনা অনুপস্থিত। কিছু বিরোধী নেতা পার্টির অভ্যন্তরে হিজাব সংক্রান্ত বিতর্ককে ধর্মীয় স্বাধীনতার লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেন।
শফিকুর রহমানের এই জনসভা দেশের আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছে। জামায়াত-এ-ইসলামি যদি এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পারে, তবে শাসন‑ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং দুর্নীতি মোকাবিলায় নতুন দিকনির্দেশনা দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলো এই বক্তব্যকে ভোটারকে প্রভাবিত করার কৌশল হিসেবে দেখছে এবং নির্বাচনের ফলাফলকে নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ভবিষ্যতে পার্টির নীতি ও কর্মপরিকল্পনা কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটের মূল দিক নির্ধারণ করবে।



