মাকসুদুর রহমান, লক্ষ্মীপুরের এক যুবক, রাশিয়ায় কাজের আশায় গিয়ে শেষ পর্যন্ত ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে বাধ্য হয়েছেন। তিনি এবং আরও কয়েকজন বাংলাদেশি শ্রমিককে রাশিয়ার নিয়োগকর্তা ভুয়া সিভিল চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাশিয়ায় পাঠায়, যেখানে তারা রুশ ভাষায় লিখিত চুক্তিতে স্বাক্ষর করে, যা পরে সামরিক চুক্তি হিসেবে প্রকাশ পায়।
প্রতিবেদন অনুসারে, রাশিয়ার দালালরা বাংলাদেশি প্রার্থীদেরকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কর্মী, ইলেকট্রিশিয়ান বা অন্যান্য সিভিল পেশার প্রস্তাব দিয়ে আকৃষ্ট করে। রাশিয়া পৌঁছানোর কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তারা রুশ সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে ড্রোন ব্যবহার, অস্ত্র পরিচালনা এবং প্রাথমিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ শেষে শ্রমিকদেরকে সামরিক ক্যাম্পে পাঠিয়ে সরাসরি যুদ্ধের সামনের সারিতে পাঠানো হয়।
মাকসুদুর এবং অন্য দুই যুবকের বর্ণনা অনুযায়ী, রুশ কর্মকর্তারা তাদেরকে হুমকি দেয় যে কাজ না করলে দশ বছরের কারাদণ্ড, শারীরিক নির্যাতন বা মৃত্যুর ঝুঁকি থাকবে। এক রুশ কর্মকর্তা অনুবাদ অ্যাপের মাধ্যমে জানিয়েছিলেন, “তোমাদের এজেন্টই তোমাদের এখানে পাঠিয়েছে, আমরা তোমাদের কিনেছি।” এই হুমকির মুখে শ্রমিকদেরকে সামরিক সরবরাহ বহন, আহত সৈন্যদের উদ্ধার এবং মৃতদেহ সংগ্রহের কাজেও জোর করে নিযুক্ত করা হয়।
মাকসুদুরের ক্ষেত্রে, ছয় মাসের যুদ্ধের পর তিনি গুরুতর আঘাত পেয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। হাসপাতালে থাকা অবস্থায় তিনি বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় রাশিয়া ত্যাগ করে দেশে ফিরে আসেন। অন্য এক ভুক্তভোগী, মোহান মিয়াজি, ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে নিয়োগ পেয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। আদেশ মানতে না পারলে তাকে শারীরিক নির্যাতন করা হয় এবং ভাষা না জানার কারণে ভুল করলে অতিরিক্ত সহিংসতা সহ্য করতে হয়।
শহর ও গ্রামাঞ্চলের পরিবারগুলো এখনও অনির্ধারিতভাবে নিখোঁজ আত্মীয়দের জন্য আবেদনপত্র ধরে আছেন, প্রত্যাশা করছেন যে একদিন তারা ফিরে আসবেন। প্রতিবেদনটি উল্লেখ করে, মাকসুদুরের পাশাপাশি শতাধিক বাংলাদেশি শ্রমিককে রুশ বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করতে দেখা গেছে।
এই ঘটনা রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর মানবসম্পদ সংকটের একটি নতুন দিক উন্মোচিত করে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা জানান, রাশিয়া বিদেশি শ্রমিককে নিয়োগ করে সামরিক বাহিনীর ঘাটতি পূরণ করার চেষ্টা করছে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিন্দার মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও রাশিয়ার এই প্রথা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানিয়েছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই বিষয়ে রাশিয়ার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার দাবি জানিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্রের মতে, বাংলাদেশি নাগরিকের নিরাপত্তা রক্ষা করা সরকারের অগ্রাধিকার এবং রাশিয়ার সঙ্গে এই ধরনের অবৈধ নিয়োগ বন্ধের জন্য কূটনৈতিক চাপ বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে, রাশিয়ার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক শ্রম চুক্তি পুনর্বিবেচনা করে ভবিষ্যতে এধরনের প্রতারণা রোধের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইউক্রেনের যুদ্ধের আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে, রাশিয়া বিদেশি শ্রমিককে সামরিক কাজে ব্যবহার করা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী যুদ্ধবন্দী ও বেসামরিক নাগরিকের সুরক্ষা নিশ্চিত করা গ্যারান্টি লঙ্ঘন করে। জেনেভা কনভেনশন স্পষ্টভাবে বলে যে, বেসামরিক নাগরিককে সামরিক কাজে বাধ্য করা নিষিদ্ধ। এই প্রেক্ষিতে, মানবাধিকার সংস্থা গুলো রাশিয়ার ওপর আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতে মামলা দায়েরের সম্ভাবনা উত্থাপন করেছে।
অঞ্চলীয় পর্যায়ে, ভারত, নেপাল এবং আফ্রিকান দেশগুলোর নাগরিকদেরও একই রকম প্রতারণার শিকার হওয়ার রিপোর্ট পাওয়া গেছে। এ ধরনের বহুমুখী নিয়োগ রাশিয়ার সামরিক কৌশলের একটি অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে বিভিন্ন দেশের শ্রমিককে সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে ফ্রন্টলাইনে ব্যবহার করা হয়।
বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলো রাশিয়ার এই কৌশলকে কঠোরভাবে নিন্দা করেছে এবং ইউক্রেনের সংঘাতের সমাধানে কূটনৈতিক চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি মানবিক সহায়তা প্রদানকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ভবিষ্যতে রাশিয়ার এই প্রথা বন্ধ করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা বাড়বে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন।
বাংলাদেশি শ্রমিকদের এই অভিজ্ঞতা দেশের শ্রম বাজারে বিদেশি কর্মসংস্থানের ঝুঁকি সম্পর্কে নতুন আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে। সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলোকে শ্রমিকদেরকে সঠিক তথ্য প্রদান, বৈধ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা এবং বিদেশে কাজের জন্য প্রয়োজনীয় কনসুলার সহায়তা বাড়াতে আহ্বান জানানো হচ্ছে।
এই ঘটনা রাশিয়ার যুদ্ধের মানবিক দিককে নতুন করে উন্মোচিত করেছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রাশিয়ার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের মোকাবিলায় আরও দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে উদ্বুদ্ধ করেছে।



