মঙ্গলবার বিকেলে ঢাকার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় কর কাঠামোর পুনর্গঠনের ওপর কাজ করা জাতীয় টাস্কফোর্সের প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের সামনে উপস্থাপন করা হয়। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. জায়েদী সাত্তার নেতৃত্বে ১১ সদস্যের দলটি রিপোর্ট হস্তান্তর করে।
প্রতিবেদন জমা দেওয়ার মুহূর্তে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী, অর্থ বিভাগের সচিব ড. মো. খায়রুজ্জামান মজুমদার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারক এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব মো. আবদুর রহমান খান উপস্থিত ছিলেন।
কমিটির সভাপতি ড. জায়েদী সাত্তার এবং অন্যান্য সদস্যরাও সমাবেশে অংশ নেন। সদস্যদের মধ্যে ড. সুলতান হাফিজ রহমান (ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভার্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট), ড. সৈয়দ মইনুল আহসান (কনকর্ডিয়া ইউনিভার্সিটি, কানাডা), ড. মোহাম্মদ জাহিদ হোসাইন (বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক), ড. খুরশীদ আলম (পিআরআই), মাহতাব উদ্দিন আহমেদ (আইসিএমএবি), সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর (এলএফএমইএবি), মুহাম্মদ মেহেদী হাসান (আইসিএবি), শাহ মো. আব্দুল খালেক (এফবিসিআই), স্নেহাশীষ বড়ুয়া (এফবিসিআই বাজেট এক্সপার্ট কমিটি) এবং কমিটির সদস্যসচিব মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান পাটওয়ারী উপস্থিত ছিলেন।
প্রতিবেদনের মূল লক্ষ্য হল কর-জিডিপি অনুপাতকে কাঙ্ক্ষিত স্তরে উন্নীত করা এবং দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করা। এতে স্বল্পমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী সুপারিশের মাধ্যমে কর নীতির পুনর্গঠন প্রস্তাব করা হয়েছে, যা অভ্যন্তরীণ ও বহির্বাণিজ্য উভয় ক্ষেত্রেই সহায়ক হবে।
কমিটির বিশ্লেষণে দেখা যায়, বর্তমান কর কাঠামোতে কিছু সেক্টরে অতিরিক্ত বোঝা এবং অন্য সেক্টরে আয়কর সংগ্রহের ঘাটতি রয়েছে। এধরনের অসমতা রাজস্বের স্থায়িত্বকে প্রভাবিত করে এবং বিনিয়োগের পরিবেশকে দুর্বল করে।
প্রস্তাবিত সংস্কারগুলোতে কর ভিত্তি বিস্তৃত করা, করের হার সমন্বয়, এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কর সংগ্রহের কার্যকারিতা বাড়ানো অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের জন্য বিশেষ কর সুবিধা প্রদান করে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে এই সুপারিশগুলো বিনিয়োগকারীদের জন্য ইতিবাচক সংকেত হতে পারে। করের স্বচ্ছতা ও পূর্বাভাসযোগ্যতা বাড়লে ব্যবসা সম্প্রসারণে আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পাবে, ফলে বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগ (এফডিআই) এবং স্থানীয় মূলধন প্রবাহ উভয়ই ত্বরান্বিত হবে।
অন্যদিকে, কর হার সমন্বয়ের ফলে কিছু উচ্চ আয়ের সেক্টরে সাময়িক চাপ সৃষ্টি হতে পারে। তাই, সরকারকে ধীরে ধীরে রূপান্তর পরিকল্পনা তৈরি করে সংশ্লিষ্ট শিল্পের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখতে হবে, যাতে অর্থনৈতিক গতি না হারায়।
প্রতিবেদনটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে কর সংগ্রহের প্রযুক্তিগত দিকগুলোকে আধুনিকায়ন করার পরামর্শ দেয়। ইলেকট্রনিক ফাইলিং, রিয়েল-টাইম ডেটা শেয়ারিং এবং স্বয়ংক্রিয় যাচাই প্রক্রিয়া এই রূপান্তরের মূল উপাদান।
দীর্ঘমেয়াদে, কর কাঠামোর পুনর্গঠন দেশের বাজেট ঘাটতি কমাতে এবং সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পে অতিরিক্ত তহবিল সরবরাহে সহায়তা করবে বলে কমিটি আশা প্রকাশ করেছে। এতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য আর্থিক সক্ষমতা বাড়বে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন, সফল বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি এবং প্রশাসনিক দক্ষতা দুটোই অপরিহার্য। নীতি পরিবর্তনের পরেও পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া চালু রাখতে হবে, যাতে প্রয়োজন অনুযায়ী সমন্বয় করা যায়।
সারসংক্ষেপে, কর কাঠামোর পুনর্বিন্যাসে সংক্ষিপ্ত ও দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপের সমন্বয় দেশের আর্থিক স্বাস্থ্যের উন্নতি, বিনিয়োগের পরিবেশ শক্তিশালীকরণ এবং টেকসই অর্থনৈতিক বৃদ্ধির ভিত্তি স্থাপন করবে। এই দিকগুলোতে সরকার কীভাবে অগ্রসর হবে, তা দেশের ব্যবসা ও বাজারের ভবিষ্যৎ দিক নির্ধারণ করবে।



