বগুড়ার ঐতিহাসিক মহাস্থানগড়ের দুর্গনগরীর পশ্চিমে অবস্থিত বিসমর্দন এলাকায় প্রত্নতাত্ত্বিক দল সম্প্রতি পাঁচটি ভিন্ন বসতি কালের চিহ্ন উন্মোচন করেছে। এই অনুসন্ধান বগুড়া প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয় এবং স্থানীয় ইতিহাসের ধারাবাহিকতা নির্ণয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ সরবরাহ করে।
কাজটি শুরু হয় ১২ জানুয়ারি, যখন ছয়জনের একটি দল বিসমর্দনে খনন কাজ আরম্ভ করে। দলটি জানুয়ারি শেষে পর্যন্ত সমাপ্তি করার পরিকল্পনা করেছে, ফলে এক মাসের মধ্যে প্রাথমিক স্তরের বিশ্লেষণ সম্পন্ন হবে।
প্রত্নতাত্ত্বিকরা জানিয়েছেন, খননের ফলে প্রাচীন সময়ের পাঁচটি ভিন্ন বসতি স্তর শনাক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে ৮শ থেকে ১ হাজার বছর আগে নির্মিত মন্দিরের সম্ভাবনা রয়েছে। এই মন্দিরগুলো বিভিন্ন ঐতিহাসিক সময়ের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ, যেমন মৌর্যপূর্ব, মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন এবং মুসলিম যুগ।
খননস্থলে পাওয়া নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে ছাপাঙ্কিত স্বর্ণের মুদ্রা, পোড়া মাটির নকশা করা ফলক, বিভিন্ন ধাতব ও মাটির মূর্তি, এবং পাথরে খোদাই করা গুরুত্বপূর্ণ বস্তু। এসব বস্তু প্রতিটি সময়ের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বৈশিষ্ট্যকে প্রতিফলিত করে, যা গবেষকদের জন্য সময়ের স্তর নির্ধারণে সহায়ক।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হল একটি মাটির পাত্র, যার উৎপত্তি যীশু খৃষ্টের জন্মের বহু বছর পূর্বের বলে অনুমান করা হচ্ছে। এই পাত্রের উপস্থিতি অঞ্চলটির প্রাচীনতা ও আন্তর্জাতিক সংযোগের ইঙ্গিত দেয়।
প্রধান লক্ষ্য ছিল দুর্গনগরীর অভ্যন্তরে ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় বসতি গঠনের সময়সীমা ও সমসাময়িকতা নির্ণয় করা। বিসমর্দনে ধারাবাহিকভাবে মন্দির নির্মাণের প্রমাণ পাওয়া যায়, যেখানে সর্বনিম্ন স্তরের কাঠামো প্রাচীন করতোয়া নদীর বন্যা সমভূমির ওপর স্থাপিত।
মন্দিরের প্রাচীরের নির্মাণে ব্যবহৃত ইটগুলো পাল আমলের পুরনো ইট পুনর্ব্যবহার করে তৈরি, যা খ্রিস্টাব্দ চতুর্থ শতক থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যে কোনো সময়ে নির্মিত হতে পারে। এই পুনর্ব্যবহারিত ইটের বৈশিষ্ট্য এবং নির্মাণ শৈলী মন্দিরের বয়স নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র সরবরাহ করে।
মন্দিরগুলো ভূমি সমতল থেকে প্রায় পাঁচ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে নির্মিত, যা শক্ত মাটির ওপর বন্যা-প্রবণ ভূমিতে স্থাপিত। এই উচ্চতা ও স্থাপত্য শৈলী দুর্গনগরীর অভ্যন্তরে পাওয়া অন্যান্য কাঠামোর সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, ফলে অঞ্চলটির সামগ্রিক নগর পরিকল্পনা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক এ.কে.এম. সাইফুল রহমান উল্লেখ করেন, মন্দিরগুলোর নির্মাণ ৮শ থেকে ১ হাজার বছর আগে হতে পারে। তিনি আরও বলেন, বিসমর্দনের মন্দিরের অবকাঠামো দুর্গনগরীর অভ্যন্তরের কাঠামোর সঙ্গে সমান্তরাল, যা পূর্ববর্তী মন্দিরের ধ্বংসের পর নতুন মন্দিরের পুনর্নির্মাণের সূচক।
এই গবেষণা মহাস্থানগড়ের ইতিহাসকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করার সুযোগ দেয় এবং ভবিষ্যতে অতিরিক্ত স্তরের অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে। স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে এই ধরনের প্রত্নতাত্ত্বিক কাজের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা হলে, আমাদের প্রাচীন নগরীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আরও সমৃদ্ধ হবে।
প্রত্নতাত্ত্বিক দল এখন পর্যন্ত সংগৃহীত নিদর্শনের বিশদ বিশ্লেষণ চালিয়ে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে আরও গভীর গবেষণার মাধ্যমে মহাস্থানগড়ের সময়সীমা ও নগর পরিকল্পনা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা গড়ে তোলার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।



