যশোর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বৃহৎ আকারের উড়োজাহাজের উড্ডয়ন ও অবতরণ ক্ষমতা সম্প্রসারণের কাজ চলছে। বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) এর চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক মঙ্গলবারের নিরাপত্তা মহড়া অনুষ্ঠানে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানান। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য আন্তর্জাতিক মানের সেবা নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে বড় জেটের নিরাপদ চলাচলকে সমর্থন করা।
বেবিচক চেয়ারম্যান উল্লেখ করেন, রানওয়ের শক্তি বৃদ্ধিকরণ প্রকল্প সম্পন্ন হলে যশোরে বৃহৎ জেটের নিরাপদ উড্ডয়ন সম্ভব হবে। বর্তমান রানওয়ে সম্প্রসারণ কাজের মাধ্যমে পাইলের গঠন ও পৃষ্ঠের শক্তি বাড়ানো হচ্ছে, যা ওজন ও দৈর্ঘ্য উভয় দিক থেকে বড় বিমানকে সমর্থন করবে। এই প্রযুক্তিগত উন্নয়ন বিমানবন্দরের সক্ষমতা বাড়িয়ে আঞ্চলিক সংযোগকে ত্বরান্বিত করবে।
বিমানবন্দরের নতুন বহির্গমন টার্মিনাল ভবন ও আধুনিক এপ্রোনের নির্মাণ ইতিমধ্যে সমাপ্ত হয়েছে। নতুন টার্মিনাল যাত্রী প্রবাহকে সহজতর করে এবং আন্তর্জাতিক মানের সেবা প্রদান করে। এপ্রোনের সম্প্রসারণের ফলে একসাথে একাধিক বড় জেটকে পার্কিং ও সেবা প্রদান সম্ভব হবে, যা এয়ারলাইনগুলোর সময়সূচি ও কার্যকারিতা বাড়াবে।
চেয়ারম্যান জোর দিয়ে বলেন, যাত্রীসেবা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে নিয়মিত নিরাপত্তা মহড়া অপরিহার্য। এসব মহড়া সম্ভাব্য দুর্বলতা চিহ্নিত করে এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় শক্তিশালী করে। নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ না হলে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের আস্থা হারিয়ে যেতে পারে, ফলে আয় ও বাজার শেয়ার হ্রাস পেতে পারে।
বেবিচক উল্লেখ করেন, চলতি বছর অনুষ্ঠিতব্য আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (ICAO) নিরাপত্তা অডিটের প্রস্তুতিতে এই মহড়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। অডিটে নিরাপত্তা প্রোটোকল, জরুরি সাড়া এবং সমন্বয় ক্ষমতা মূল্যায়ন করা হয়; তাই বাস্তবিক মহড়া ফলাফল অডিটের স্কোরে সরাসরি প্রভাব ফেলবে। সফল অডিট ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের প্রবাহ বাড়াতে সহায়তা করবে।
মঙ্গলবারের মহড়ায় বেলা ১১:২৫ টায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে যশোরের উদ্দেশ্যে একটি এয়ার বাংলাদেশ ফ্লাইট উড়ে যায়। উড্ডয়নের কিছু মুহূর্তের মধ্যেই বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপকের কাছে বেনামি ফোনে বোমা হুমকি জানানো হয়। হুমকি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কন্ট্রোল টাওয়ার ও এভিয়েশন সিকিউরিটি ইনচার্জকে অবহিত করা হয়।
হুমকি বিশ্লেষণের পর বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপক পূর্ণাঙ্গ বিমানবন্দর জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন এবং ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার সক্রিয় করেন। তৎক্ষণাৎ বিমানবাহিনী, সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, সিভিল ডিফেন্স এবং মেডিকেল ইউনিটসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ শুরু করে। এই দ্রুত সাড়া প্রোটোকল জরুরি পরিস্থিতিতে সময়মত প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করে।
মহড়ায় অংশগ্রহণকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে বেবিচক, বাংলাদেশ বিমানবাহিনী, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ গার্ড, রেডি অ্যারোড্রোমস ব্রিগেড (RAB), এয়ারপোর্ট পলিসি ব্যুরো (APB), আনসার, ফায়ার সার্ভিস, সিভিল ডিফেন্স এবং যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের মেডিকেল টিম অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রতিটি সংস্থা নিজেদের দায়িত্ব অনুযায়ী জরুরি সেবা, নিরাপত্তা ও চিকিৎসা সহায়তা প্রদান করে। সমন্বিত প্রচেষ্টা মহড়ার বাস্তবিকতা ও কার্যকারিতা বাড়িয়ে তুলেছে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বেবিচকের সদস্য (প্রশাসন) এস এম লাবলুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। মহড়ার পরিকল্পনা ও তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব বেবিচকের সদস্য (নিরাপত্তা) এয়ার কমডোর মো. আসিফ ইকবাল পালন করেন। তাদের নেতৃত্বে মহড়া সময়সূচি, সিমুলেশন দৃশ্য এবং সমন্বয় প্রোটোকল নির্ধারিত হয়।
বড় জেটের উড্ডয়ন সক্ষমতা বাড়ার ফলে যশোর বিমানবন্দরের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করেন। বৃহৎ জেটের ব্যবহার আন্তর্জাতিক রুট, কার্গো ফ্লাইট এবং পর্যটন সংযোগকে ত্বরান্বিত করবে, যা স্থানীয় হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও পরিবহন সেবার চাহিদা বাড়াবে। এয়ারলাইনগুলোও নতুন রুট যোগ করার সুযোগ পাবে, ফলে টিকিট বিক্রয় ও এয়ারপোর্ট ফি বৃদ্ধি পাবে।
নিরাপত্তা মহড়া এবং ICAO অডিটের প্রস্তুতি বিমানবন্দরের আন্তর্জাতিক সুনামকে শক্তিশালী করবে, যা বিদেশি বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক অংশীদারিত্বের সম্ভাবনা বাড়াবে। একই সঙ্গে, নিরাপত্তা মানদণ্ডের ধারাবাহিক উন্নয়ন বিমানের বীমা প্রিমিয়াম কমাতে এবং অপারেশনাল ঝুঁকি হ্রাসে সহায়তা করবে। সামগ্রিকভাবে, যশোরের বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্প দেশের আঞ্চলিক বিমান পরিবহন নেটওয়ার্কে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।



