চীনের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে গত সপ্তাহান্তে একাধিক বরখাস্তের খবর প্রকাশিত হয়েছে, যা দেশের সামরিক শৃঙ্খলায় বিশাল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। ৭৫ বছর বয়সী জেনারেল ঝাং ইউসিয়া এবং জেনারেল লিউ ঝেনলিকে একসঙ্গে পদত্যাগের আদেশ দেওয়া হয়েছে। এই পদক্ষেপের পেছনের কারণ সরকারীভাবে জানানো হয়নি, তবে বিশ্লেষকরা এর প্রভাব নিয়ে আলোচনা করছেন।
ঝাং ইউসিয়া পূর্বে কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের (সিএমসি) উপ-চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করতেন এবং পার্টির শীর্ষ স্তরে ছিলেন। লিউ ঝেনলি আরেকজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা, যাঁর পদমর্যাদা সিএমসির উচ্চতর স্তরে ছিল। উভয়ের একসাথে বরখাস্ত হওয়া সিএমসির ঐতিহাসিক গঠনকে নাটকীয়ভাবে পরিবর্তন করেছে।
সিএমসি সাধারণত সাতজন সদস্য নিয়ে গঠিত, তবে সাম্প্রতিক শুদ্ধিকরণে এই সংখ্যা মাত্র দুইজনের কাছে নেমে এসেছে। এখন সিএমসির সদস্য হলেন চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং এবং জেনারেল ঝাং শেংমিন। পূর্বে অন্যান্য সদস্যদেরও ধীরে ধীরে অপসারণ করা হয়েছে, যা পার্টির অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের সূচক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশন চীনের লক্ষ লক্ষ সৈন্যের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং দেশের সামরিক নীতি নির্ধারণে সর্বোচ্চ ক্ষমতা ধারণ করে। এই সংস্থার ক্ষমতা এতটাই বিস্তৃত যে, শি জিনপিংয়ের হাতে সিএমসির চেয়ারম্যানের একমাত্র পদটি ছিল। সিএমসির সদস্যসংখ্যা হ্রাসের ফলে এই সংস্থার অভ্যন্তরীণ কাঠামোতে বিশাল শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে।
এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক লাইল মরিস উল্লেখ করেন, সিএমসিতে এখন শুধুমাত্র শি জিনপিং এবং একজন জেনারেল অবশিষ্ট থাকা একটি অপ্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থা। তিনি বলেন, এই অবস্থা পার্টির সামরিক শাখার জন্য অস্বাভাবিক এবং পূর্বে কখনও দেখা যায়নি। মরিসের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির নেতৃত্বে বিশাল বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে।
মরিস আরও উল্লেখ করেন, শীর্ষ জেনারেলদের একসাথে অপসারণের ফলে পিএলএ-তে নেতৃত্বের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে, যা সামরিক কৌশল ও অপারেশনাল সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি সতর্ক করেন যে, এই ধরনের শূন্যতা শি জিনপিংয়ের সামরিক নিয়ন্ত্রণকে দুর্বল করতে পারে এবং পার্টির অভ্যন্তরে ক্ষমতার ভারসাম্যকে পরিবর্তন করতে পারে।
ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের সহযোগী অধ্যাপক চং জা ইয়ানও ঝাংয়ের বরখাস্তের সঠিক কারণ সম্পর্কে অনিশ্চিত থাকলেও, বিভিন্ন অনুমান উত্থাপিত হয়েছে বলে জানান। তিনি উল্লেখ করেন, কিছু সূত্রে পারমাণবিক গোপনীয়তা ফাঁস, অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্র এবং অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষের কথা বলা হচ্ছে। এছাড়া বেইজিংয়ে সম্ভাব্য গোলাগুলির গুজবও ছড়িয়ে পড়েছে।
চং জা ইয়ান জোর দিয়ে বলেন, জেনারেলদের পদত্যাগ এবং এইসব গুজব দুটি স্বতন্ত্র বিষয় এবং তাদের মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করা এখনও অনুমানসাপেক্ষ। তিনি বিশ্লেষণ করেন, যদিও উভয়ই দেশের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে, তবে বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণ করা কঠিন।
বিশ্লেষকরা সম্মত যে, শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের হঠাৎ বরখাস্ত চীনের ভবিষ্যৎ সামরিক নীতি ও কৌশলগত লক্ষ্যগুলিতে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে তাইওয়ান সংক্রান্ত কোনো বড় আঞ্চলিক সংঘাতে চীনের প্রস্তুতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে এই নেতৃত্বের শূন্যতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
পরবর্তী সময়ে সিএমসির নতুন সদস্যদের নির্বাচন এবং শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে সামরিক কাঠামোর পুনর্গঠন কীভাবে হবে, তা দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হবে। বিশেষজ্ঞরা প্রত্যাশা করছেন, শি জিনপিং এই শূন্যতা পূরণে আরও ঘনিষ্ঠভাবে সামরিক শীর্ষের সঙ্গে কাজ করবেন এবং পার্টির সামরিক নিয়ন্ত্রণকে পুনরায় দৃঢ় করবেন।



