পশ্চিমবঙ্গের বারাসাতের একটি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর, এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশ তাদের বিমানবন্দর ও সীমান্তে অতিরিক্ত স্বাস্থ্য নজরদারি চালু করেছে। পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, এই মাসের শুরুর দিকে পাঁচজন স্বাস্থ্যকর্মী ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন, যার মধ্যে একজনের অবস্থা গুরুতর। সংক্রমণের সম্ভাব্য সংস্পর্শে থাকা প্রায় ১১০ জনকে বর্তমানে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। নিপাহ ভাইরাস প্রাণঘাতী, প্রাণী থেকে মানুষের দেহে ছড়ায় এবং মানুষ থেকে মানুষেও সংক্রমিত হতে পারে।
থাইল্যান্ডের বিমানবন্দরগুলো, বিশেষ করে ব্যাংকক ও ফুকেট, পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা যাত্রীদের জন্য স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া এবং স্বাস্থ্য সংক্রান্ত ঘোষণাপত্র সংগ্রহের ব্যবস্থা করেছে। একই সময়ে নেপাল সরকারও কাঠমান্ডু বিমানবন্দর এবং ভারতের সঙ্গে যুক্ত স্থল সীমান্তে বিশেষ সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তাছাড়া তাইওয়ান কর্তৃপক্ষ নিপাহ ভাইরাসকে জনস্বাস্থ্যের জন্য উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ (ক্যাটাগরি ফাইভ) রোগ হিসেবে তালিকাভুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নিপাহ ভাইরাসকে কোভিড-১৯ এবং জিকার মতো শীর্ষ দশটি অগ্রাধিকার রোগের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, রোগটির মৃত্যুর হার ৪০ শতাংশ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে, এবং এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর টিকা বা নির্দিষ্ট ওষুধ পাওয়া যায়নি। রোগের উপসর্গ সাধারণত সংক্রমণের চার থেকে চৌদ্দ দিনের মধ্যে প্রকাশ পায়; প্রাথমিকভাবে জ্বর, মাথাব্যথা, পেশি ব্যথা এবং বমি ভাব দেখা যায়, তবে তীব্র ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া ও মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনসেফালাইটিস) দেখা দিতে পারে, যা মৃত্যুর প্রধান কারণ।
নিপাহ ভাইরাস প্রথমবার ১৯৯৮ সালে মালয়েশিয়ায় শনাক্ত হয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে রোগের বিস্তার লক্ষ্য করা যায়, বিশেষ করে কেরালা রাজ্যে গত কয়েক বছরে বহু মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগ কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে, যার মধ্যে সংক্রমিত এলাকায় চলাচল সীমাবদ্ধ করা এবং স্বাস্থ্য কর্মীদের জন্য সুরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ অন্তর্ভুক্ত।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, এশিয়ার দেশগুলো নিপাহ ভাইরাসের সম্ভাব্য বিস্তার রোধে সমন্বিতভাবে কাজ করছে। থাইল্যান্ড ও নেপাল সরকার তাদের বিমানবন্দর ও সীমান্তে স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং বাড়িয়ে তুলেছে, এবং তাইওয়ান সরকার রোগের ঝুঁকি মূল্যায়ন করে উচ্চতর ক্যাটাগরিতে তালিকাভুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে। এই ধরনের সমন্বিত পদক্ষেপ রোগের দ্রুত সনাক্তকরণ ও বিস্তার রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুসারে, রোগের সন্দেহজনক ক্ষেত্রে দ্রুত পরীক্ষা ও আইসোলেশন করা জরুরি। স্বাস্থ্য কর্মীদের জন্য সঠিক সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং রোগীর জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যদিও বর্তমানে কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ বা টিকা উপলব্ধ নয়, তবে সমর্থনমূলক থেরাপি ও শ্বাসযন্ত্রের যত্ন রোগীর পুনরুদ্ধারে সহায়তা করতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য বিভাগ রোগের বিস্তার রোধে জনসাধারণকে সতর্ক করেছে, যাতে অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলা এবং কোনো উপসর্গ দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে নিকটস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে যোগাযোগ করা হয়। এছাড়া, স্বাস্থ্য কর্মীদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও সুরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহের মাধ্যমে সংক্রমণের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
নিপাহ ভাইরাসের বর্তমান পরিস্থিতি দেখিয়ে দেয় যে, সংক্রামক রোগের মোকাবিলায় দ্রুত সনাক্তকরণ, আন্তর্জাতিক সমন্বয় এবং জনসচেতনতা অপরিহার্য। রোগের বিস্তার রোধে প্রত্যেকের দায়িত্ব পালন করা এবং স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা মেনে চলা জরুরি। আপনার আশেপাশে কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করুন এবং স্বাস্থ্যের প্রতি সতর্কতা বজায় রাখুন।



