গত সোমবার সৌদি আরবের রিয়াদে গ্লোবাল লেবার মার্কেট সম্মেলনের সাইডলাইনে বাংলাদেশ ও মালদ্বীপ সরকারের প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য ছিল দু’দেশের শ্রম বাজারের পারস্পরিক চাহিদা ও সম্ভাব্য সহযোগিতা নির্ধারণ করা। এতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল, মালদ্বীপের উচ্চশিক্ষা, শ্রম ও দক্ষতা উন্নয়ন মন্ত্রী ড. আলী হায়দার আহমেদ, শ্রমবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড. আব্দুল্লাহ নাজির এবং প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. সাইফুল হক চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।
ড. আসিফ নজরুল বৈঠকে মালদ্বীপের শ্রমবাজারে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, নার্স এবং শিক্ষকসহ উচ্চ দক্ষ পেশাজীবীর চাহিদা বাড়ানোর প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে বাংলাদেশ সরকার থেকে নিয়মিত ও প্রশিক্ষিত কর্মী সরবরাহ করলে দু’দেশের শ্রম ঘাটতি দ্রুত পূরণ হবে। একই সঙ্গে তিনি মালদ্বীপে বর্তমানে অনিয়মিত ও নথিভুক্তহীন বাংলাদেশি কর্মীদের নিয়মিতকরণে ত্বরান্বিত পদক্ষেপের আহ্বান জানান।
মালদ্বীপের শ্রম ও উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী ড. আলী হায়দার আহমেদ এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়ে আরও বেশি দক্ষ কর্মী নিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি বিশেষ করে স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো খাতে বিশেষজ্ঞের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশ সরকার থেকে নিয়োগকৃত পেশাজীবীরা মালদ্বীপের উন্নয়ন প্রকল্পে সরাসরি অবদান রাখবে। এছাড়া তিনি বাংলাদেশের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে মালদ্বীপে শিক্ষা মেলা আয়োজনের জন্য আমন্ত্রণ জানান, যাতে শিক্ষার্থী ও প্রতিষ্ঠান দু’পাশের সংযোগ স্থাপিত হয়।
ড. আসিফের অনুরোধের সঙ্গে সঙ্গে ড. আলী হায়দার আহমেদ মালদ্বীপের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা সংস্থাগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনা প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, যদি বাংলাদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মালদ্বীপে ক্যাম্পাস বা শাখা প্রতিষ্ঠা করে, তবে তা দু’দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। এই ধরনের শিক্ষা বিনিময় কেবল শিক্ষার গুণগত মান বাড়াবে না, বরং দু’দেশের তরুণ পেশাজীবীর কর্মসংস্থান সম্ভাবনাও বৃদ্ধি করবে।
বৈঠকে অনিয়মিতভাবে কাজ করা বাংলাদেশি শ্রমিকদের নিয়মিতকরণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। ড. আসিফের মতে, নথিভুক্ত না হওয়া কর্মীরা শ্রমিকের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ, ফলে দু’দেশের শ্রম নীতি ও সামাজিক সুরক্ষায় ফাঁক সৃষ্টি হয়। তিনি প্রস্তাব করেন, মালদ্বীপ সরকার দ্রুত একটি রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া চালু করে সকল অনিয়মিত কর্মীর তথ্য সংগ্রহ করে তাদের বৈধ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করবে।
মালদ্বীপের শ্রমবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড. আব্দুল্লাহ নাজির এবং অতিরিক্ত সচিব মো. সাইফুল হক চৌধুরীও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। দুজনেই ড. আসিফের প্রস্তাবকে সমর্থন জানিয়ে বললেন, ভবিষ্যতে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও ভিসা প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বাড়ানো হবে। তারা উল্লেখ করেন, এই ধরনের কাঠামোগত সহযোগিতা দু’দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে শক্তিশালী করবে।
বাজার বিশ্লেষকেরা অনুমান করছেন, যদি বাংলাদেশ সরকার থেকে প্রতি বছর ১,০০০ থেকে ১,৫০০ দক্ষ কর্মী মালদ্বীপে নিয়োগ করা হয়, তবে মালদ্বীপের শ্রমিক ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া, কাজের ভিসা ও অনুমোদন থেকে সৃষ্ট রাজস্বও দু’দেশের জন্য অতিরিক্ত আয় হিসেবে গণ্য হবে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা ও অবকাঠামো প্রকল্পে বিদেশি বিশেষজ্ঞের অংশগ্রহণ প্রকল্পের সময়সীমা হ্রাস এবং খরচ কমাতে সহায়ক হবে।
বাংলাদেশের জন্যও এই উদ্যোগের অর্থনৈতিক প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষ কর্মীর রপ্তানি সরাসরি দেশের বেকারত্ব হ্রাসে সহায়তা করবে এবং বিদেশি মুদ্রা আয় বাড়াবে। তদুপরি, শিক্ষা মেলা ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখা প্রতিষ্ঠা দেশের উচ্চশিক্ষা খাতের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা বাড়াবে, যা দীর্ঘমেয়াদে গবেষণা ও উদ্ভাবনের সুযোগ সৃষ্টি করবে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হিসেবে, দু’দেশের প্রতিনিধিরা পরবর্তী মাসে একটি গঠনমূলক চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা আলোচনা করছেন। এই চুক্তিতে কর্মী নিয়োগের মানদণ্ড, প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম, ভিসা প্রক্রিয়া এবং শ্রমিকের কল্যাণ নিশ্চিত করার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত হবে। তবে, নথিভুক্তহীন কর্মীর নিয়মিতকরণে আইনি জটিলতা ও প্রশাসনিক বাধা মোকাবিলার জন্য স্পষ্ট নীতি প্রণয়ন জরুরি।
সারসংক্ষেপে, রিয়াদে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশ ও মালদ্বীপ সরকার দক্ষ কর্মী নিয়োগ, অনিয়মিত শ্রমিকের নিয়মিতকরণ এবং শিক্ষা মেলা আয়োজনের মাধ্যমে পারস্পরিক লাভজনক সহযোগিতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে একাধিক প্রস্তাব উপস্থাপন করেছে। এই উদ্যোগের সফল বাস্তবায়ন উভয় দেশের শ্রম বাজারের গুণগত মান উন্নত করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।



