২৭ জানুয়ারি মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধু ক্যানটিনের সামনে ‘উইমেনস সাইবার প্রোটেকশন কাউন্সিল’ (ডব্লিউসিপিসি) একটি সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করে নতুন প্ল্যাটফর্মের সূচনা ঘোষণা করে। এই সংগঠন নারীদের বিরুদ্ধে সাইবার হয়রানি, চরিত্রহনন এবং অনলাইন সহিংসতা মোকাবিলার জন্য গঠিত এবং দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সমন্বিত পদক্ষেপের লক্ষ্য রাখে।
সম্মেলনে উপস্থিত বক্তারা অনলাইন জগতে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়ার সমস্যাকে কেন্দ্র করে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তারা উল্লেখ করেন যে, ডিজিটাল মাধ্যমগুলো এখন নারীদের জন্য ভয় ও আতঙ্কের উৎসে পরিণত হয়েছে এবং সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে ১,৭০০‑এর বেশি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) দাখিল করা সত্ত্বেও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। ফলে অপরাধীরা আরও নির্লজ্জ হয়ে উঠছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের নারীবিষয়ক সম্পাদক চেমন ফারিয়া ইসলাম মেঘলা বলেন, ডব্লিউসিপিসি একটি সমন্বিত সেবা কেন্দ্র, যার কাজ আজ থেকে শুরু হয়েছে। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে যেকোনো নারী আইনি সহায়তা, পরামর্শ ও মানসিক সমর্থন পেতে পারবে এবং সেবা শুধুমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সীমাবদ্ধ না থেকে সমগ্র দেশে বিস্তৃত হবে।
লিখিত বিবৃতিতে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, বর্তমান ডিজিটাল পরিবেশে নারীদের জন্য সাইবার বুলিং ও চরিত্রহনন একটি গুরুতর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে গৃহীত পদক্ষেপের ঘাটতি অপরাধীদের অবিচলিত আচরণকে উস্কে দিচ্ছে, যা সমাজের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর প্রশ্ন তুলেছে।
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সচিব অদিতি ইসলাম উল্লেখ করেন, ইন্টারনেটের ‘মব কালচার’ এখন রাস্তাঘাট ও ক্লাসরুমে ছড়িয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক মতবিরোধের মুহূর্তে কিছু শিক্ষার্থী ও গোষ্ঠী নারীদের চরিত্রহনন করে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন নিপীড়ন বিরোধী সেল বা মনিটরিং সেলকে অকার্যকর করে তুলেছে। তদুপরি, বেশিরভাগ প্রফেসর এই সমস্যায় যথাযথ পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হচ্ছেন।
ডব্লিউসিপিসির কার্যনির্বাহী সদস্য হেমা চাকমা বলেন, গালি-গালাজ বা চরিত্রহননের মাধ্যমে নারীদের দমিয়ে রাখা যায় না। রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে নারীর সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং সুষ্ঠু রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য সকল দলের নারীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা জরুরি। অন্য দলের নারীদের অবহেলা করা কোনো রাজনৈতিক সংগঠনকে নারীবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে পারে না।
ডব্লিউসিপিসি আগামী বৃহস্পতিবার সাইবার অপরাধীদের অবহেলার বিস্তারিত প্রমাণ জনসমক্ষে উপস্থাপন করার পরিকল্পনা করেছে। এই প্রকাশের মাধ্যমে তারা অপরাধীদের দায়িত্বশীল করা এবং আইনি প্রক্রিয়ার ত্বরান্বিত করা লক্ষ্য রাখে। সংগঠনটি একই সঙ্গে সাইবার হয়রানির শিকার নারীদের জন্য আইনি সহায়তা, পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা প্রদান করবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
ডব্লিউসিপিসির উদ্যোগের পটভূমিতে দেখা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নারীদের বিরুদ্ধে আক্রমণ বাড়ছে এবং সাইবার অপরাধের শিকার নারীদের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। যদিও জিডি দাখিলের সংখ্যা বাড়লেও, কার্যকর পদক্ষেপের অভাবের ফলে অপরাধীরা অব্যাহতভাবে আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে।
এই নতুন প্ল্যাটফর্মের প্রতিষ্ঠা নারীদের জন্য সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ডব্লিউসিপিসি আশা করে, সঠিক আইনি কাঠামো ও সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে অনলাইন পরিবেশকে নিরাপদ করে তোলা সম্ভব হবে এবং ভবিষ্যতে নারীদের ওপর সাইবার আক্রমণ কমে যাবে।
সংবাদ সম্মেলনের পর, উপস্থিত অংশগ্রহণকারীরা ডব্লিউসিপিসির কার্যক্রমের বিস্তারিত পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য নিয়ে আলোচনা করেন। তারা জোর দেন, সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় ও সিভিল সোসাইটি একসঙ্গে কাজ করা প্রয়োজন। শেষ পর্যন্ত, ডব্লিউসিপিসি আগামী বৃহস্পতিবারের প্রমাণ উপস্থাপনকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী আইনি পদক্ষেপের সূচনা করতে চায়, যা সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করবে।



