বাংলাদেশের জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তে মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) হিন্দুধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের আয়োজনে অনুষ্ঠিত গণভোট প্রচার সভায় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ গণভোটের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতীয় সনদের রেফারেন্ডাম দেশের সংবিধানিক কাঠামোকে বহুমূল্য, বহু-ধর্মীয় ও বহু-ভাষিক রূপে পুনর্গঠন করার লক্ষ্য রাখে।
রীয়াজের মতে, মূল লক্ষ্য ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, বরং নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকের সমান অধিকার নিশ্চিত করা। তিনি জোর দেন, এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের বিজয় অত্যন্ত জরুরি, কারণ তা সনদের মূল ধারাগুলোর স্বীকৃতি দেয়।
জুলাই জাতীয় সনদে বাংলাদেশকে একটি বহুজাতি, বহুমতীয় ও বহুভাষিক দেশ হিসেবে সংবিধানে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। রীয়াজ জানান, বাংলা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে থাকবে, তবে দেশের অন্যান্য মাতৃভাষা ও সংস্কৃতিকেও সমানভাবে সংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এটি পাহাড়-সমতল বিভাজনের রাজনীতি নয়, বরং সমতার ভিত্তিতে ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার প্রচেষ্টা।
গত ৫৪ বছর ধরে নাগরিক অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক অধিকার সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত করা যায়নি, এ কথা রীয়াজ উল্লেখ করেন। তিনি অতীতের অভাবগুলোকে তুলে ধরে বর্তমান সনদের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করেন, যাতে সকল নাগরিকের সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত হয়।
গণভোটের প্রক্রিয়া সম্পর্কে রীয়াজ স্পষ্ট করেন, ভোটাররা দুটি ব্যালট পাবেন—একটি রাজনৈতিক প্রার্থীদের জন্য এবং অন্যটি গণভোটের জন্য। গণভোটের ব্যালটে ‘হ্যাঁ’ চিহ্ন টিক করা মানে জুলাই জাতীয় সনদের পক্ষে সমর্থন প্রকাশ করা। তিনি ভোটারদের সতর্ক করেন, গণভোটের নামে ভুল তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা ভোটের স্বচ্ছতাকে ক্ষুণ্ন করতে পারে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ঘটিত গণ-অভ্যুত্থানের কথা স্মরণ করে রীয়াজ বলেন, সেই সময়ের শহীদদের ধর্ম, ভাষা বা অঞ্চল অনুযায়ী কোনো পার্থক্য করা হয়নি; সবাইকে সমানভাবে শহীদ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তিনি যুক্তি দেন, বিভাজনের রাজনীতি সমাজকে দুর্বল করে, আর সমতার ভিত্তিতে গড়ে তোলা নীতি রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে।
রীয়াজ আরও উল্লেখ করেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সুষ্ঠু রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং ভোটাধিকার নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে স্বৈরাচার পুনরায় ফিরে আসার ঝুঁকি থাকে। তিনি গণভোটকে এক ধরনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের সুযোগ হিসেবে দেখেন, যেখানে দেশটি বৈষম্যমূলক কাঠামো বজায় রাখবে নাকি নাগরিক সমতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার পথে অগ্রসর হবে, তা নির্ধারিত হবে।
প্রতিপক্ষের কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠী সনদের প্রস্তাবকে নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা দাবি করে, জাতীয় সনদে অতিরিক্ত ভাষা ও সংস্কৃতির স্বীকৃতি দেওয়া জাতীয় পরিচয়কে বিভক্ত করতে পারে এবং কেন্দ্রীয় শাসনের ক্ষমতা হ্রাসের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। এছাড়া, কিছু দল রেফারেন্ডামের স্বচ্ছতা ও স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, যা ভোটারদের মধ্যে সন্দেহের সৃষ্টি করতে পারে।
এই মতবিরোধের পরিপ্রেক্ষিতে রীয়াজের আহ্বান স্পষ্ট: ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে দেশের সংবিধানিক কাঠামোকে অধিক অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলা সম্ভব। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ভোটের ফলাফলই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে কীভাবে বহুমাত্রিক সমাজের মডেল গড়ে তুলবে।
গণভোটের ফলাফল দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন দিকনির্দেশনা আনতে পারে। যদি ‘হ্যাঁ’ ভোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জিত হয়, তবে সরকার দ্রুত সনদের ধারাগুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করবে। অন্যদিকে, ‘না’ ভোটের উচ্চ শতাংশ সনদের প্রস্তাবকে পুনর্বিবেচনার দরকারি করে তুলবে এবং রাজনৈতিক আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলবে।
সারসংক্ষেপে, আলী রীয়াজের বক্তব্যে জাতীয় সনদের জন্য ‘হ্যাঁ’ ভোটকে দেশের সমতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সংবিধানিক সংস্কারের মূল চাবিকাঠি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। একই সময়ে, বিরোধী গোষ্ঠীর উদ্বেগগুলোও গণভোটের পূর্বে জনমত গঠনে প্রভাব ফেলবে। আসন্ন রেফারেন্ডাম দেশের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



