ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ভারত এ প্রায় দুই দশকের অনিয়মিত আলোচনার পর একটি ঐতিহাসিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যা আজ দিল্লিতে ঘোষিত হয়েছে। এই চুক্তি উভয় পক্ষের কৌশলগত ও বাণিজ্যিক সম্পর্ককে গভীর করার লক্ষ্যে গৃহীত।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উর্সুলা ভন ডের লেয়েন এবং ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কোস্টা দিল্লিতে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেন। দুজনেই ভারত এ-র অর্থনৈতিক নীতি ও বাজারে নতুন সুযোগের কথা উল্লেখ করেন।
দুই পক্ষের মূল উদ্দেশ্য হল যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক চাপের মুখে কৌশলগত অংশীদারিত্বকে শক্তিশালী করা। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বছর ভারত এ-র ওপর ৫০% শুল্ক আরোপের ফলে বাণিজ্যিক পরিবেশ জটিল হয়ে উঠেছিল।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক নীতি এখনও যুক্তরাষ্ট্র-ভারত এ বাণিজ্য আলোচনাকে ধীর করে রাখে, যদিও দুই দেশের মধ্যে চুক্তি চূড়ান্ত করার প্রচেষ্টা চলছে। একই সময়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে বাণিজ্যিক সংঘাত বাড়ানোর হুমকি দেন, গ্রিনল্যান্ডের সম্ভাব্য অধিগ্রহণের বিরোধে, পরে তিনি এই হুমকি প্রত্যাহার করেন।
উর্সুলা ভন ডের লেয়েনের বিবৃতিতে তিনি উল্লেখ করেন যে দুই বিলিয়ন মানুষের বাজারকে একত্রিত করে একটি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল গড়ে তোলা হয়েছে এবং এটি কেবল সূচনা। তিনি আরও বলেন, কৌশলগত সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করা হবে।
আন্তোনিও কোস্টা উল্লেখ করেন যে এই চুক্তি বিশ্বকে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা দেয় যে ভারত এ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন শুল্কের চেয়ে বাণিজ্য চুক্তিকে বেশি মূল্য দেয়, বিশেষ করে সুরক্ষাবাদী নীতি বাড়ার সময়ে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের উল্লেখ না করে এই দৃষ্টিকোণ তুলে ধরেন।
চুক্তির বিশদ বিষয়গুলি শীঘ্রই একটি মিডিয়া ব্রিফিং-এ প্রকাশের আশা করা হচ্ছে। ব্রিফিং-এ চুক্তির সুনির্দিষ্ট সেক্টর ও শুল্ক হ্রাসের হার প্রকাশের সম্ভাবনা রয়েছে।
উর্সুলা ভন ডের লেয়েন ও আন্তোনিও কোস্টা সপ্তাহান্তে দিল্লিতে পৌঁছান এবং সোমবারের রিপাবলিক ডে উদযাপনে প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নেন। তাদের উপস্থিতি দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
মঙ্গলবার তারা নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ফটো তোলেন, যেখানে পারস্পরিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের দৃশ্য দেখা যায়। এই মুহূর্তটি মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে।
চুক্তির আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর এখনও বছরের শেষের দিকে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের অনুমোদনের পর নির্ধারিত হবে। অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে চুক্তি কার্যকর হবে।
বাজার বিশ্লেষকরা এই চুক্তিকে ভারত এ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের রপ্তানি-আমদানি প্রবাহে নতুন গতিবেগের সূচক হিসেবে দেখছেন, বিশেষ করে কৃষি, ফার্মা এবং ডিজিটাল সেবা খাতে। তারা আশা করেন যে শুল্ক হ্রাসের ফলে পণ্যের মূল্য প্রতিযোগিতামূলক হবে।
তবে শুল্ক হ্রাসের বাস্তবায়ন এবং ইউরোপীয় মানদণ্ডের সাথে সামঞ্জস্যের প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ হতে পারে, যা স্বল্পমেয়াদে লজিস্টিক খরচে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। এই ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য উভয় পক্ষের নিয়ন্ত্রক সংস্থার সমন্বয় প্রয়োজন।
দীর্ঘমেয়াদে চুক্তি ভারত এ-কে ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশের বাধা কমিয়ে, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে উচ্চ প্রযুক্তি ও পরিষেবা খাতে নতুন প্রকল্পের সম্ভাবনা বাড়বে।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বাণিজ্যিক টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে এই চুক্তি ভারত এ-কে বিকল্প বাজার হিসেবে ইউরোপকে শক্তিশালী করতে পারে, যা অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকে উৎসাহিত করবে।



