আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারকরা রোড্রিগো দুতের্তে-কে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে ট্রায়ালযোগ্য বলে ঘোষণা করেছেন। রায়টি সোমবার প্রকাশিত হয় এবং ২৩ ফেব্রুয়ারি একটি “অভিযোগ নিশ্চিতকরণ” শুনানির তারিখ নির্ধারিত হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ভিত্তি হল দুতের্তের মানসিক ও শারীরিক সক্ষমতা, যা আদালত প্রমাণিত করেছে যে তিনি প্রক্রিয়াগত অধিকারগুলি কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে সক্ষম।
দুতের্তে গত বছর মার্চ থেকে হ্যাগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে আটক রয়েছেন। তার আইনজীবীরা পূর্বে যুক্তি দিয়েছিলেন যে ৮০ বছর বয়সের দুতের্তে মানসিকভাবে অযোগ্য এবং আইনি প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে সক্ষম নন। তবে আদালতের বিশেষজ্ঞ মেডিকেল প্যানেল তার স্বাস্থ্যগত অবস্থা পর্যালোচনা করে এই দাবিকে খারিজ করেছে।
দুতের্তে তার শাসনামলে “মাদক যুদ্ধ” নামে পরিচিত অভিযান চালিয়ে বহু সংখ্যক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ। সরকারী রেকর্ড অনুযায়ী, এই অভিযান চলাকালে হাজার হাজার ছোট মাদক বিক্রেতা, ব্যবহারকারী এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আদালতের হস্তক্ষেপ ছাড়াই হত্যা করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এই হত্যাকাণ্ডকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে।
দুতের্তে ২০১৬ থেকে ২০২২ পর্যন্ত ফিলিপাইনের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি মাদক যুদ্ধকে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রেখে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথ প্রশস্ত করার দাবি দিয়ে সমর্থন পেয়েছিলেন। তার শাসনামলে মাদক সংক্রান্ত অপরাধের সংখ্যা হ্রাসের দাবি করা হলেও, মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা ব্যাপক সমালোচনা করেছেন।
আদালতের রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মেডিকেল বিশেষজ্ঞদের মতামত অনুযায়ী দুতের্তে তার প্রক্রিয়াগত অধিকারগুলি সঠিকভাবে ব্যবহার করতে সক্ষম। বিচারকরা বলছেন, তিনি যথাযথভাবে তার রক্ষা করার অধিকার এবং ট্রায়াল প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে সক্ষম। এই মূল্যায়ন দুতের্তের বয়স ও স্বাস্থ্যের প্রভাবকে সম্পূর্ণভাবে বাদ দেয় না, তবে তা যথেষ্ট বলে বিবেচিত হয়েছে।
বিচারকরা আরও স্পষ্ট করে বলেছেন যে, প্রক্রিয়াগত ও ন্যায়সঙ্গত ট্রায়াল অধিকার কার্যকরভাবে ব্যবহার করার জন্য মানসিক সক্ষমতা সর্বোচ্চ স্তরে থাকতে হবে না। তারা উল্লেখ করেছেন যে, দুতের্তের বর্তমান মানসিক অবস্থা তাকে যথাযথভাবে তার রক্ষা করার সুযোগ দেয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে আদালত তার ট্রায়ালযোগ্যতা নিশ্চিত করেছে।
দুতের্তের অন্যতম কঠোর সমালোচক, লেইলা দে লিমা, রায়ের পর মন্তব্যে জানান যে, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে শিকারের কণ্ঠস্বরকে প্রযুক্তিগত অজুহাতের মাধ্যমে অবহেলিত করা হবে না। তিনি উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে দুতের্তের বিচার শিকারের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তার এই মন্তব্য শিকারের পরিবার ও মানবাধিকার কর্মীদের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে।
দুতের্তে মার্চ ২০২৫-এ ম্যানিলা বিমানবন্দরে গ্রেপ্তার হন, যখন তার উত্তরসূরি ফার্দিনান্দ “বংবং” মারকোস জুনিয়রের সঙ্গে তার পারিবারিক জোট ভেঙে যায়। এই গ্রেপ্তার ফিলিপাইনের রাজনৈতিক দৃশ্যে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করে। দুতের্তের সমর্থক ও বিরোধী উভয় পক্ষই এই ঘটনার প্রতি তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন।
জনমত দুতের্তের গ্রেপ্তারের পর বিভক্ত হয়ে পড়েছে। মানবাধিকার সংস্থা ও নাগরিক সমাজের গোষ্ঠী তার মাদক যুদ্ধকে নৃশংসতা হিসেবে নিন্দা করে, তবে তার পপুলিস্ট নীতি ও বঞ্চিত জনগণের প্রতি আহ্বান এখনও কিছু অংশে সমর্থন পায়। এই দ্বন্দ্ব ফিলিপাইনের রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলেছে।
মে ২০২৪-এ দুতের্তে দাভাও শহরের মেয়র নির্বাচিত হন, যদিও তিনি তখনো হ্যাগে আটক ছিলেন। এই নির্বাচনী জয় তার জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক প্রভাবের একটি অস্বাভাবিক উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে তার মেয়রিত্বের বাস্তবায়ন এখনও অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নির্ধারিত ২৩ ফেব্রুয়ারি শুনানিতে বিচারকরা সিদ্ধান্ত নেবেন যে, দুতের্তের বিরুদ্ধে প্রোসিকিউশনের প্রমাণ যথেষ্ট কিনা এবং মামলাটি ট্রায়াল পর্যায়ে অগ্রসর হবে কিনা। এই শুনানি শিকারের পরিবার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি মুহূর্ত। যদি ট্রায়াল চালু হয়, তবে দুতের্তের মাদক যুদ্ধের সময়কালে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার শেষ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
সারসংক্ষেপে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রায় দুতের্তের ট্রায়ালযোগ্যতা নিশ্চিত করেছে এবং অভিযোগ নিশ্চিতকরণ শুনানির মাধ্যমে মামলার পরবর্তী ধাপ নির্ধারিত হয়েছে। এই প্রক্রিয়া শিকারের কণ্ঠস্বরকে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের মঞ্চে তুলে ধরবে এবং ফিলিপাইনের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও আইনি দৃশ্যে প্রভাব ফেলবে।



