মার্কিন নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের যৌথ অভিযান গত চার মাসে ক্যারিবিয়ান সাগর ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে মোট ৩৬ বার চালানো হয়েছে। এই অপারেশনের ফলে কমপক্ষে ১২৬ ব্যক্তি প্রাণ হারিয়েছেন, যার মধ্যে বেশিরভাগই মাদকবাহী নৌযানের ক্রু। ঘটনাটি সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর দক্ষিণাঞ্চলীয় কমান্ড সোমবার (২৬ জানুয়ারি) একটি বিবৃতি প্রকাশ করে জানায়।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সেপ্টেম্বর মাসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশে মেক্সিকো ও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশের সীমান্তে প্রবাহিত মাদককে ‘বন্যার মতো’ প্রবাহিত হওয়া হিসেবে চিহ্নিত করে, যুক্তরাষ্ট্রের জলসীমায় প্রবেশের ইচ্ছুক নৌযানগুলোর ওপর আক্রমণ শুরু করা হয়। সেই নির্দেশের পর থেকে ক্যারিবিয়ান সাগর ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে ধারাবাহিকভাবে ৩৬টি অভিযান চালানো হয়েছে।
এই ৩৬টি অভিযানে মোট ১২৬ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। মার্কিন সেনাবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, মৃতদের মধ্যে ১১৬ জনের দেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, যেখানে বাকি ১০ জনের দেহ এখনও সাগরে ভেসে যাওয়া অবস্থায় পাওয়া যায়নি। দেহের অনুপস্থিতি সম্পর্কে বলা হয়েছে, তারা আক্রমণের সময়ই নিখোঁজ হয়েছেন, তাই তাদের মৃত্যুর কারণ সরাসরি মার্কিন হামলা হিসেবে স্বীকৃত।
অতিরিক্ত তথ্য প্রকাশে বলা হয়েছে, নিহতদের মধ্যে অন্তত আটজন নৌযান বা ছোট জাহাজ থেকে সাঁতার কেটে সাগরে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তবে তারা সাঁতার কাটার সময়ই গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। এই বিষয়টি সংশ্লিষ্ট অপারেশনের তীব্রতা ও ঝুঁকি নির্দেশ করে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সেপ্টেম্বরের মন্তব্যে মেক্সিকো, ভেনেজুয়েলা, কলম্বিয়া, ব্রাজিলসহ কয়েকটি দক্ষিণ আমেরিকান দেশের সরকারকে মাদক পাচারের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়। তিনি দাবি করেন, এই দেশগুলোর শাসক গোষ্ঠী গ্যাংকে সমর্থন দিচ্ছে, যা ক্যারিবিয়ান ও পূর্ব প্রশান্ত সাগরের রুটে মাদককে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের প্রধান পথ করে তুলেছে।
এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলায় একটি বিস্তৃত অপারেশন চালায়। অপারেশনের সময় ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে রাজধানী কারাকাসের সরকারি বাসভবন থেকে জব্দ করে নেওয়া হয়। উভয় দম্পতির ওপরও মাদক পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে এবং বর্তমানে তাদের বিচারের প্রস্তুতি চলছে।
মাদুরো-ফ্লোরেস দম্পতির মামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আদালতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। আদালত তাদের বিরুদ্ধে মাদক পাচার, অবৈধ সম্পদ লুকিয়ে রাখা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা হুমকি সৃষ্টি করার অভিযোগে দায়ের করা হয়েছে। বিচার প্রক্রিয়া চলাকালীন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও ভেনেজুয়েলীয় সরকার উভয়ই দম্পতির অধিকার রক্ষার আহ্বান জানিয়েছে।
মার্কিন সেনাবাহিনীর দক্ষিণাঞ্চলীয় কমান্ডের মতে, ক্যারিবিয়ান ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে চালু করা অপারেশনগুলোতে ভবিষ্যতে আরও তদন্ত ও পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাবে। সংশ্লিষ্ট নৌবাহিনীর ইউনিটগুলো মাদকবাহী নৌযানের সনাক্তকরণ, আটক ও ধ্বংসের জন্য উন্নত রাডার ও ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোও এই অভিযানের আইনি দিকগুলো বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় বিচারিক পদক্ষেপ নেবে।
এই ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক মাদক পাচার নেটওয়ার্কের জটিলতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক-আইনি প্রতিক্রিয়ার তীব্রতা উভয়ই প্রকাশ করে। ভবিষ্যতে ক্যারিবিয়ান ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে মাদক প্রবাহ কমাতে সমন্বিত আঞ্চলিক সহযোগিতা ও আইনি কাঠামোর উন্নয়ন প্রয়োজন হবে।



