মৌশি (মাধ্যমিক) পরিচালক প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল ২৬ জানুয়ারি সোমবার জানিয়েছেন যে, বাংলাদেশ সরকার সকল সরকারি‑বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট অফিসে অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ এবং তামাকমুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে। এই নির্দেশনা রবিবার, ২৫ জানুয়ারি মৌশি (মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর) থেকে প্রেরিত হয়ে দেশের প্রতিটি বিদ্যালয়, কলেজ এবং শিক্ষা অফিসে পৌঁছেছে।
নতুন আদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১০০ মিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে তামাকজাত পণ্য বিক্রয়, ব্যবহার এবং প্রচার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তামাকের বিক্রয়কেন্দ্র, ধূমপান কক্ষ বা কোনো ধরণের প্রচারমূলক উপকরণকে ঐ এলাকার বাইরে সরিয়ে রাখতে হবে। এই পদক্ষেপের লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যের সুরক্ষা এবং তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে দূরে রাখা।
প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে তামাকমুক্ত হিসেবে ঘোষণা করতে এবং স্পষ্ট সাইনেজ স্থাপন করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সাইনেজে তামাকমুক্ত নীতি এবং নিষেধাজ্ঞার তথ্য বাংলায় এবং ইংরেজিতে উভয়ই উল্লেখ করতে হবে, যাতে সকল স্টেকহোল্ডার সহজে বুঝতে পারে। তাছাড়া, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের যৌথ ঘোষণার বাস্তবায়নও আদেশে অন্তর্ভুক্ত, যা তামাক নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত প্রচেষ্টা নিশ্চিত করবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (FCTC) অনুসারে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তামাক শিল্পের কোনো ধরণের পৃষ্ঠপোষকতা বা প্রচারণা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এই আন্তর্জাতিক চুক্তির ধারাগুলি বাংলাদেশ সরকারের নীতি গঠনে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, ফলে বিদ্যালয়গুলোতে তামাকের কোনো রূপে উপস্থিতি থাকবে না।
পুষ্টি সংক্রান্ত দিকেও নির্দেশনা স্পষ্ট করা হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অস্বাস্থ্যকর খাবার ও উচ্চ চিনি যুক্ত পানীয়ের বিপণন সীমিত করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীদের খাবার নির্বাচন স্বাস্থ্যকর হয়। তদুপরি, ক্যাফেটেরিয়া ও ক্যান্টিনে স্বল্প লবণ, কম চিনি এবং ট্রান্স‑ফ্যাটমুক্ত খাবার সরবরাহের জন্য বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ক্যান্টিনের মেনুতে তাজা ফল, শাকসবজি এবং প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। উচ্চ চিনি ও উচ্চ ফ্যাটযুক্ত স্ন্যাক্সের পরিবর্তে স্বাস্থ্যকর বিকল্প যেমন বাদাম, দই এবং হোমমেড স্যালাডের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই পরিবর্তনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পুষ্টি ঘাটতি কমে এবং দীর্ঘমেয়াদে রোগের ঝুঁকি হ্রাস পাবে।
সরকারি সভা ও সমাবেশের ক্যাটারিংয়ে এখন থেকে তাজা ফল, বাদাম এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর স্ন্যাক্স অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। অতিরিক্ত চিনি বা কৃত্রিম রঙের খাবার বাদ দিয়ে প্রাকৃতিক উপাদানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, যা অংশগ্রহণকারীদের শক্তি ও মনোযোগ বজায় রাখতে সহায়তা করবে।
শারীরিক সক্রিয়তা নিশ্চিত করার জন্য প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দৈনিক কমপক্ষে ৩০ মিনিট মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার ব্যায়াম পরিচালনা করতে হবে। ব্যায়ামের মধ্যে দৌড়, সাইক্লিং, যোগব্যায়াম বা দলগত খেলাধুলা অন্তর্ভুক্ত করা যাবে। যেখানে মাঠের সুবিধা নেই, সেখানে ইনডোর কার্যক্রম যেমন ব্যালেট, জিমন্যাস্টিক্স বা ভলিবল আয়োজিত করা যাবে।
শিশুদের জন্য সাঁতার শেখানোর উদ্যোগ গ্রহণের কথাও নির্দেশনায় উল্লেখ রয়েছে। সাঁতার ক্রীড়া শারীরিক ক্ষমতা বাড়ায় এবং শ্বাসপ্রশ্বাসের উন্নতি ঘটায়, ফলে শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। পাশাপাশি, কর্মীদের জন্য প্রতি ঘণ্টায় ডেস্ক‑ভিত্তিক স্ট্রেচিং ব্যায়াম প্রবর্তনের সুপারিশ করা হয়েছে, যাতে দীর্ঘ সময় বসে কাজ করার ফলে সৃষ্ট পেশী টান কমে।
অবকাঠামো দিক থেকে নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ও বয়স্কদের জন্য সিঁড়ি ও র্যাম্পসহ সুবিধাজনক ডিজাইন নিশ্চিত করতে হবে। লিফটের পরিবর্তে সিঁড়ি ব্যবহারকে উৎসাহিত করা হয়েছে, যাতে শারীরিক কার্যকলাপ বাড়ে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া যায়। এইসব ব্যবস্থা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও নিরাপদ পরিবেশে রূপান্তরিত করবে।
আপনার বিদ্যালয় বা অফিসে এই নির্দেশনা কার্যকর করতে প্রথমে তামাকমুক্ত ঘোষণা প্রস্তুত করুন, সাইনেজ বসান এবং ক্যাফেটেরিয়া মেনুতে স্বাস্থ্যকর বিকল্প যুক্ত করুন। এরপর দৈনিক শারীরিক কার্যক্রমের সময়সূচি নির্ধারণ করুন এবং কর্মীদের জন্য স্ট্রেচিং রুটিন তৈরি করুন। এই পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করলে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, এবং বাংলাদেশ সরকার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে তা পূরণে সহায়তা করবে।



