বাংলাদেশ সরকারের বন্ড সুবিধা ব্যবহার করে বস্ত্রশিল্পে ব্যাপক অনিয়মের মুখোমুখি হওয়া দেখা দিয়েছে। ভুয়া প্রাপ্যতা দেখিয়ে অতিরিক্ত সুতা ও কাপড় আমদানি করে খোলাবাজারে বিক্রি করা হচ্ছে, ফলে দেশের প্রাইমারি বস্ত্র খাতের উৎপাদন ও রপ্তানি ক্ষমতা হুমকির মুখে পড়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সীমিত হস্তক্ষেপের ফলে এই সমস্যার সমাধান এখনো পর্যাপ্ত নয়।
বন্ড সুবিধা মূলত রপ্তানিকারকদের জন্য শুল্কমুক্ত কাঁচামাল গুদামজাত করার সুবিধা প্রদান করে, যাতে সময় সাশ্রয় হয় এবং রপ্তানি প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়। সরকার এই ব্যবস্থা টেক্সটাইল শিল্পের প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে চালু করেছিল, এবং উদ্যোক্তাদের জন্য কাঁচামাল সংরক্ষণের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করার উদ্দেশ্য ছিল। তবে সুবিধার কাঠামোই অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করেছে।
অনুপ্রবেশকারী ব্যবসায়ীরা ভুয়া প্রাপ্যতা ও মিথ্যা তথ্যের মাধ্যমে বন্ড সুবিধা পেয়ে অতিরিক্ত সুতা ও কাপড় আমদানি করে, যা পরে খোলাবাজারে বিক্রি করা হয়। এই পদ্ধতিতে উচ্চ কাউন্টের সুতা ও কাপড়ের বদলে কম মানের সুতার তথ্য দেওয়া হয়, ফলে শুল্কমুক্ত আমদানি সম্ভব হয়। এছাড়া, কোনো প্রকৃত মিলের অস্তিত্ব না থাকা সত্ত্বেও মিলের নামে আমদানি চালু করা হয়, যা সরাসরি দেশীয় স্পিনিং ও উইভিং মিলের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করে।
অবৈধ আমদানির পরিমাণ বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ সদর, আড়াইহাজার, মাধবদী, বাবুরহাট, নরসিংদী, পাবনা, সিরাজগঞ্জ এবং বেলকুচি এলাকায় ব্যাপকভাবে দেখা যাচ্ছে। এই অঞ্চলগুলোতে মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে আমদানি করা সুতা ও কাপড় বাজারে স্বল্পমূল্যে বিক্রি হচ্ছে, ফলে স্থানীয় উৎপাদকদের বিক্রয়মূল্য হ্রাস পাচ্ছে। উচ্চ মানের সুতা ও কাপড়ের বিকল্প না থাকায় কিছু দেশীয় মিলের উৎপাদন থেমে গেছে, আর কিছু ক্ষেত্রে উৎপাদিত পণ্য বিক্রি না হওয়ায় স্টক জমে আছে।
উদ্যোক্তারা জানান, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার অব্যাহত থাকলে দেশের বস্ত্রশিল্পের কারখানাগুলো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাবে। বিনিয়োগকারী উদ্যোক্তারা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন এবং নতুন বিনিয়োগের ইচ্ছা কমে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি ব্যাংকগুলোর জন্যও ঝুঁকি তৈরি করছে, কারণ বস্ত্রশিল্পের ঋণ পরিশোধে দেরি হলে ব্যাংকগুলো ঋণ ডিফল্টের সম্মুখীন হতে পারে।
অবৈধ আমদানি ও বিক্রয়ের ফলে দেশীয় স্পিনিং ও উইভিং মিলের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যখন একই পণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে কমে যাচ্ছে। ফলে দেশীয় উৎপাদনকারীরা বাজারে প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছে এবং কিছু ক্ষেত্রে তাদের পণ্য বিক্রি না হওয়ায় স্টক জমে আছে। এই অপ্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ শিল্পের মোট উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাসের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাঝে মাঝে অভিযান চালানো হলেও, ফলাফল সীমিত রয়ে গেছে। কিছু এলাকায় সাময়িকভাবে অবৈধ আমদানি বন্ধ করা হয়েছে, তবে দীর্ঘমেয়াদী পর্যবেক্ষণ ও কঠোর শাস্তি না থাকলে পুনরায় একই রকম লিকেজের সম্ভাবনা রয়ে গেছে।
অবৈধ সুতা ও কাপড়ের বিক্রয় থেকে সরকার উল্লেখযোগ্য রাজস্ব হারাচ্ছে, যা দেশের সামগ্রিক ট্যাক্স সংগ্রহে প্রভাব ফেলছে। বন্ড সুবিধার মূল উদ্দেশ্য ছিল রপ্তানি বৃদ্ধির মাধ্যমে রাজস্ব বৃদ্ধি, তবে অপব্যবহারের ফলে তা উল্টো ফল দিয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়িক সমিতি ও বস্ত্রশিল্পের প্রতিনিধিরা দাবি করছেন, বন্ড সুবিধার ব্যবহার পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি স্বতন্ত্র তদারকি কমিটি গঠন করা উচিত। তদুপরি, ভুয়া প্রাপ্যতা ও মিথ্যা তথ্যের জন্য কঠোর শাস্তি আরোপ করা প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে অনুরূপ লিকেজ রোধ করা যায়।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করছেন, যদি এই সমস্যার সমাধান না করা হয়, তবে বস্ত্রশিল্পের রপ্তানি ক্ষমতা হ্রাস পাবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হবে। এছাড়া, দেশীয় উৎপাদনকারীদের আর্থিক অবস্থা খারাপ হলে কর্মসংস্থান হ্রাস পাবে, যা বৃহত্তর অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলবে।
বন্ড সুবিধার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকারকে নীতিমালা পুনর্বিবেচনা করে, স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি করতে হবে। একই সঙ্গে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে ডেটা যাচাই ও পর্যবেক্ষণের জন্য আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে, যাতে ভুয়া প্রাপ্যতা দ্রুত সনাক্ত করা যায়।
সংক্ষেপে, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার বস্ত্রশিল্পের উৎপাদন, রপ্তানি ও আর্থিক স্থিতিশীলতাকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। অবিলম্বে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে শিল্পের ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে পড়বে, এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক বৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।



