বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট খরচে বিশাল বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে, যেখানে কেন্দ্রভাড়া এক আর্থিক বছরে দশ হাজার কোটি টাকার বেশি বাড়ে। এই পরিবর্তনটি বাংলাদেশ সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অন্তর্বর্তী সরকারের নীতি‑নির্ধারণের পরিপ্রেক্ষিতে ঘটেছে।
মন্ত্রিপরিষদে খরচ কমিয়ে সাশ্রয় নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা চালু থাকা সত্ত্বেও, ইউনিট প্রতি বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় প্রায় আট শতাংশ বেড়েছে। এই বৃদ্ধি মূলত জ্বালানি সরবরাহের অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা মূল্যের ওঠানামার ফলে হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেন্দ্রভাড়ার মোট পরিমাণ এক বছরের মধ্যে দশ হাজার কোটি টাকায় বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিমাণের বৃদ্ধির পেছনে তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে, যা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন।
প্রথম কারণ হল গ্যাসের সরবরাহের হ্রাস। গ্যাসকে তুলনামূলকভাবে সস্তা জ্বালানি হিসেবে গণ্য করা হলেও, সাম্প্রতিক সময়ে সরবরাহের ঘাটতি দেখা দিয়েছে, ফলে গ্যাস‑ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে।
দ্বিতীয় কারণ হিসেবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) থেকে বাড়তি দাম নেওয়া হয়েছে, যদিও বৈশ্বিক তেল মূল্যে হ্রাস দেখা গিয়েছে। বিপিসি গ্যাসের দাম বাড়িয়ে পিডিবির ব্যয় বাড়িয়ে তুলেছে।
তৃতীয় কারণ হল ডলারের মুদ্রা মূল্যের বৃদ্ধি। ডলারের রেট ১০ টাকা থেকে ১২ টাকায় উঠে যাওয়ায়, ভারত থেকে দৈনিক প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎ আমদানি এবং বিদেশি ঋণ পরিশোধের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
কেন্দ্রভাড়া হল এমন একটি ফি, যা চুক্তি অনুসারে সরকারি ও বেসরকারি সব বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সংগ্রহ করা হয়। উৎপাদন হোক বা না হোক, প্রতিটি কেন্দ্রকে নির্ধারিত ক্ষমতার জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ চার্জ দিতে হয়, যা কেন্দ্রভাড়া নামে পরিচিত।
২০২২-২৩ অর্থবছরে পিডিবি মোট ২৪,৯১১ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা রিপোর্ট করেছে, এবং সেই বছরে কেন্দ্রভাড়া প্রায় ২৫,০০০ কোটি টাকা ছিল। পরবর্তী বছর, ২০২৩-২৪-এ উৎপাদন ক্ষমতা ২৮,০৯৮ মেগাওয়াটে বৃদ্ধি পেয়ে কেন্দ্রভাড়া ৩২,০০০ কোটি টাকায় পৌঁছায়।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে দশটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি নবায়ন না হওয়ায় ক্ষমতা ২৭,৪১৪ মেগাওয়াটে হ্রাস পায়, তবে কেন্দ্রভাড়া ৪২,০০০ কোটি টাকায় বৃদ্ধি পায়। ফলে এক বছরের ব্যবধানে কেন্দ্রভাড়া দশ হাজার কোটি টাকায় বাড়ে।
ভারত থেকে দৈনিক প্রায় ২,৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হয়, যার বিল ডলারে পরিশোধ করতে হয়। এছাড়া, বিদেশি ঋণযুক্ত কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রের কিস্তি পরিশোধেও ডলার ব্যবহার করা হয়, যা ডলারের রেট বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মোট ব্যয়কে তীব্র করে।
বর্তমানে দেশে মোট ১৩৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্র কার্যকর, যার মধ্যে বেসরকারি অংশ ৬৮টি। পিডিবি সূত্র অনুযায়ী, বেসরকারি কেন্দ্রের বিলের অধিকাংশই ডলারে হিসাব করা হয়, যদিও পেমেন্ট টাকায় করা হতে পারে। বেসরকারি খাতের ৯০ শতাংশের বেশি কেন্দ্রের সম্পূর্ণ বিল ডলারে রূপান্তরিত হয়।
সৌরশক্তি ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়; তাদের উৎপাদন ও বিক্রয় হিসাব সম্পূর্ণভাবে ডলারে করা হয়। এই পদ্ধতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা বাজারের ওঠানামার প্রভাবকে সরাসরি দেশীয় বিদ্যুৎ খাতে প্রবেশ করায়।
সারসংক্ষেপে, গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি, বিপিসি থেকে বাড়তি গ্যাস দাম এবং ডলারের রেট বৃদ্ধি একত্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট ব্যয়কে তীব্র করেছে। কেন্দ্রভাড়া বৃদ্ধির ফলে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপ বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের বিদ্যুৎ বিলের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ভবিষ্যতে গ্যাস সরবরাহের স্থিতিশীলতা এবং মুদ্রা রেটের নিয়ন্ত্রণই ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষার মূল চাবিকাঠি হবে।



