মাদকাসক্তি সম্পর্কিত সর্বশেষ জাতীয় গবেষণায় প্রকাশিত হয়েছে যে, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৮২ লক্ষ মানুষ মাদকের ওপর নির্ভরশীল। এই তথ্যটি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তহবিলে পরিচালিত গবেষণার ফল, যা দেশের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ক্ষেত্রে গভীর উদ্বেগের কারণ।
মাদক সমস্যা বিশ্বব্যাপী একটি মারাত্মক স্বাস্থ্য ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ, যা সমৃদ্ধ ও উন্নয়নশীল উভয় দেশকে প্রভাবিত করে। অপরাধের হার বৃদ্ধি, শ্রমশক্তির উৎপাদনশীলতা হ্রাস এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি এই সমস্যার প্রধান দিক।
বাংলাদেশ সরাসরি মাদক উৎপাদনকারী দেশ নয়, তবে ভৌগোলিকভাবে এটি দু’টি প্রধান মাদক উৎপাদন অঞ্চলের সংযোগস্থলে অবস্থিত। দক্ষিণ-পূর্বে থাইল্যান্ড, মিয়ানমার ও লাওসের ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল’ থেকে আফিম উৎপন্ন হয়, আর উত্তর-পশ্চিমে পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও ইরানের ‘গোল্ডেন ক্রিসেন্ট’ থেকে। এই পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলো থেকে মাদক প্রবাহের ফলে বাংলাদেশে সরবরাহের ঝুঁকি বাড়ছে।
রাজধানীর পুলিশ প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, চুরি, চাঁদাবাজি এবং হিংসাত্মক অপরাধের বেশিরভাগই মাদকাসক্তি সঙ্গে যুক্ত। মাদক ব্যবহারকারী ব্যক্তিরা প্রায়শই অপরাধমূলক কার্যকলাপে লিপ্ত হয়ে সমাজের নিরাপত্তা পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
সম্প্রতি প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, মাদকাসক্তদের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশই ১৮ বছরের নিচে বয়সেই প্রথমবার মাদকের সঙ্গে পরিচিত হয়। তরুণ প্রজন্মের এই বৃহৎ অংশই দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার মূল শক্তি, তাই এই প্রবণতা জাতীয় উন্নয়নের জন্য গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করে।
গবেষণার ফলাফল দেখায় যে, মাদকদ্রব্যের ব্যবহার শহর ও গ্রাম উভয় এলাকায় সমানভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। কোনো একক ভৌগোলিক অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ না থেকে, মাদক সমস্যাটি দেশের প্রতিটি কোণে প্রবেশ করেছে, যা সামাজিক কাঠামোর ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলছে।
মাদকাসক্তদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি স্পষ্ট। অনেকেই গুরুতর মানসিক রোগ, হৃদরোগ, শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা এবং পুষ্টি ঘাটতির শিকার। তবে যথাযথ চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সেবার অভাবে এই রোগীরা প্রায়শই দীর্ঘস্থায়ী অবস্থায় রয়ে যায়।
চিকিৎসা সুবিধার ঘাটতি এবং সামাজিক পুনঃসংহতির সুযোগের অভাবের ফলে, মাদক ত্যাগের পর পুনরায় মাদকের দিকে ফিরে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। পুনর্বাসন কেন্দ্রের সীমিত ক্ষমতা এবং সচেতনতা কম থাকায়, পুনরাবৃত্তি চক্রটি ভাঙ্গা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সমন্বিত নীতি প্রয়োজন। প্রথমত, মাদক নির্ভর রোগীর জন্য ব্যাপক চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সম্প্রদায়ে মাদক সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তৃতীয়ত, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও সীমান্ত নিরাপত্তা শক্তিশালী করে মাদক পাচার রোধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে।
অবশেষে, মাদক সমস্যার সমাধান শুধুমাত্র সরকারী উদ্যোগে সীমাবদ্ধ নয়; পরিবার, সমাজ এবং যুব সংগঠনগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণও অপরিহার্য। আপনি কি মনে করেন, আমাদের সমাজে মাদক প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ কী হতে পারে?



