বন্ড সুবিধার অধীনে শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করা সুতা ও কাপড় অবৈধভাবে খোলাবাজারে বিক্রি হওয়ায় দেশের টেক্সটাইল শিল্প গভীর আর্থিক সংকটে ধরা পড়েছে। এই অবৈধ লেনদেনের ফলে দেশি স্পিনিং ও উইভিং মিলগুলো অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে, সরকারকে উল্লেখযোগ্য রাজস্বের ক্ষতি হয় এবং প্রায় ২,৩০০ কোটি মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ ও লক্ষ লক্ষ কর্মসংস্থান ঝুঁকির মধ্যে আটকে যায়।
সুতার ও কাপড়ের অবৈধ বিক্রয় প্রধানত নারায়ণগঞ্জ, আড়াইহাজার, মাধবদী, বাবুর হাট, নরসিংদী, পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও বেলকুচি সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘটছে। বন্ডেড গুদাম ও গার্মেন্ট ফ্যাব্রিকেশন ইউনিটের আওতায় আমদানি করা পণ্যগুলো এই এলাকায় নিয়ন্ত্রিত না হয়ে সরাসরি বাজারে প্রবেশ করছে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস এসোসিয়েশন জানিয়েছে, টেক্সটাইল ও পোশাক খাত মিলিয়ে দেশের মোট জিডিপির ২০ শতাংশের বেশি অবদান রাখে। রপ্তানি আয়ের ৮০ থেকে ৮৬ শতাংশ এই সেক্টর থেকে আসে, যার মধ্যে প্রাইমারি টেক্সটাইল শিল্প ৭০ শতাংশের বেশি সরবরাহ করে।
সেক্টরে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ২,৩০০ কোটি ডলার হিসেবে অনুমান করা হয়েছে। বর্তমানে এই মিলগুলো রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্পের নিট ফ্যাব্রিকের প্রায় শতভাগ এবং ওভেন ফ্যাব্রিকের প্রায় ষাট শতাংশ সরবরাহ করে। এ ছাড়া তারা দেশীয় বাজারের বড় অংশ এবং সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, র্যাব ও আনসারসহ বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার জন্যও কাপড় সরবরাহ করে।
শিল্পের প্রতিনিধিরা অভিযোগ করেন, বন্ড সুবিধার আওতায় ঘোষিত আমদানি পরিমাণ ও বাস্তব আমদানি পরিমাণের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে নিম্ন কাউন্টের সুতা দেখিয়ে উচ্চ কাউন্টের সুতা আমদানি করা হয়, আবার কিছু মিল উৎপাদন না করেও বন্ড লাইসেন্স ব্যবহার করে কাপড় আমদানি করে সরাসরি বাজারে বিক্রি করে।
এই ধরনের অনিয়মের ফলে শুল্কসহ উৎপাদন করা দেশি মিলগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের উৎপাদন খরচ বাড়লেও বিক্রয়মূল্য কমে যায়, ফলে লাভের মার্জিন হ্রাস পায় এবং কর্মসংস্থান সঙ্কুচিত হয়।
বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের পাশাপাশি টেক্সটাইল শিল্প গ্যাস ও বিদ্যুতের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, ডলারের ঘাটতি, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের হার, টাকার অবমূল্যায়ন এবং এলডিসি উত্তরণের শর্তে নগদ প্রণোদনা হ্রাসের মতো বহু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। এসব বহিরাগত চাপ শিল্পের আর্থিক স্বাস্থ্যের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস এসোসিয়েশন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি জোর দিয়ে দাবি করেছে, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার বন্ধ করতে দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ না নিলে প্রাইমারি টেক্সটাইল শিল্প মারাত্মক সংকটে ধসে পড়বে। তারা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বন্ড কমিশনারেটকে অবিলম্বে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, যদি এই সমস্যাগুলি সমাধান না হয়, তবে বিনিয়োগের নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান দুটোই বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে। টেক্সটাইল শিল্পের অবনতি রপ্তানি আয় হ্রাস, বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহের কমে যাওয়া এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই বন্ড সুবিধার সঠিক ব্যবস্থাপনা ও শিল্পের মৌলিক সমস্যার সমাধানকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।



