রবিবার (২৬ জানুয়ারি) সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অনুষ্ঠিত তৃতীয় গ্লোবাল লেবার মার্কেট কনফারেন্সে ড. আসিফ নজরুল, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা, ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষ জনশক্তি গঠনে বাংলাদেশ সরকারকে অগ্রগণ্য হিসেবে উপস্থাপন করেন। তিনি উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক শ্রম বাজারে প্রতিযোগিতা বজায় রাখতে বাংলাদেশকে উচ্চমানের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা যাচাই ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
ড. আসিফ নজরুলের মতে, সৌদি আরবের সঙ্গে স্বাক্ষরিত দক্ষতা যাচাই কর্মসূচি (এসভিপি) চুক্তির অধীনে বাংলাদেশ প্রতি মাসে প্রায় ষাট হাজার কর্মীর জন্য পেশাগত দক্ষতার সনদ প্রদান করছে। এই সনদগুলো সৌদি শ্রমবাজারের প্রকৃত চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ইস্যু করা হয়, ফলে কর্মীরা সরাসরি গন্তব্য দেশে প্রবেশের জন্য প্রস্তুত থাকে।
এসভিপি চুক্তি শ্রমিকদের দক্ষতা যাচাই প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও মানসম্মত করে তুলেছে, যা নিয়োগকারীর আস্থা বৃদ্ধি করে এবং শ্রমিকের কর্মসংস্থান হার উন্নত করে। প্রতি মাসে ৬০,০০০ কর্মীর এই সংখ্যা, যদি বর্তমান গতিতে বজায় থাকে, তবে বার্ষিক প্রায় সাত মিলিয়ন কর্মীর দক্ষতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
ড. নজরুল আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) কর্তৃক গৃহীত দশটি মৌলিক কনভেনশনকে বাংলাদেশের শ্রম নীতির ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। এই কনভেনশনগুলো ন্যায্যতা, কল্যাণ এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য কাঠামো প্রদান করে, যা দেশীয় শ্রমবাজারের স্বচ্ছতা ও আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য বাড়ায়।
এই নীতি সমর্থনে বাংলাদেশ সরকার ২০২৫ সালের শ্রম (সংশোধন) অধ্যাদেশ জারি করেছে। নতুন অধ্যাদেশে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন সহজীকরণ, লিঙ্গভিত্তিক মজুরি বৈষম্য দূরীকরণ এবং শ্রমিকের কালো তালিকাভুক্তি নিষিদ্ধ করার বিধান অন্তর্ভুক্ত। ফলে শ্রমিকের অধিকার রক্ষার জন্য আইনি কাঠামো শক্তিশালী হয়েছে।
ট্রেড ইউনিয়নের গঠন সহজ হওয়ায় শ্রমিক সংগঠনগুলোকে সমষ্টিগত দরকষাকষি করার সুযোগ বাড়বে, যা মজুরি ও কর্মপরিবেশের উন্নতিতে সহায়তা করবে। একইসঙ্গে লিঙ্গভিত্তিক মজুরি বৈষম্য দূরীকরণ শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াবে এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করবে। কালো তালিকাভুক্তি নিষিদ্ধকরণ শ্রমিকের চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
ড. নজরুল সম্প্রতি স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ-সৌদি আরব শ্রমিক নিয়োগ চুক্তির কথাও উল্লেখ করেন। এই চুক্তি নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে এবং শ্রমিকের অধিকার রক্ষায় দ্বিপাক্ষিক তদারকি ব্যবস্থা স্থাপন করবে বলে তিনি আশাবাদ প্রকাশ করেন। চুক্তির বাস্তবায়ন শ্রমিকের নিরাপত্তা ও মঙ্গল নিশ্চিত করার পাশাপাশি রেমিট্যান্স প্রবাহকে স্থিতিশীল করবে।
রেমিট্যান্স বাংলাদেশের মোট জিডিপির প্রায় ৭% অবদান রাখে; নিরাপদ ও দক্ষ কর্মশক্তি সরবরাহের মাধ্যমে এই প্রবাহের পরিমাণ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে গালফ দেশগুলোতে উচ্চ দক্ষতার চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ সরকার এই চাহিদা পূরণে প্রস্তুত হতে চায়।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, দক্ষ শ্রমশক্তি সরবরাহের মাধ্যমে বাংলাদেশ রপ্তানি কাঠামোতে নতুন দিক যোগ করতে পারবে। গালফ ও মধ্যপ্রাচ্যের নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রযুক্তি সেক্টরে দক্ষ কর্মীর চাহিদা বাড়ছে; এই চাহিদা পূরণে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও সার্টিফিকেশন সিস্টেমের সম্প্রসারণ জরুরি।
তবে চ্যালেঞ্জও রয়ে গেছে। প্রশিক্ষণ মানদণ্ডের ধারাবাহিকতা, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের গুণগত মান এবং দক্ষতা যাচাই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এছাড়া, শ্রমিকের প্রত্যাবর্তন ও দক্ষতা আপডেটের জন্য অব্যাহত পেশাগত উন্নয়ন প্রোগ্রাম চালু করা জরুরি।
ড. আসিফ নজরুলের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, বাংলাদেশ সরকার দক্ষ শ্রমশক্তি গঠনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান অর্জন করতে চায়। গালফ দেশগুলোর চাহিদা পূরণে দক্ষতা যাচাই প্রোগ্রাম, আইএলও কনভেনশন ও শ্রম সংশোধন অধ্যাদেশের সমন্বয় ভবিষ্যৎ প্রবণতা নির্ধারণ করবে। তবে প্রশিক্ষণ মানদণ্ডের উন্নতি ও শ্রমিকের অধিকার রক্ষায় ধারাবাহিক তদারকি না হলে এই পরিকল্পনা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
সংক্ষেপে, দক্ষতা যাচাই কর্মসূচি, আইএলও কনভেনশন গ্রহণ এবং শ্রম সংশোধন আইন একসাথে বাংলাদেশের শ্রমবাজারকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তুলবে, যা রেমিট্যান্স বৃদ্ধি, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



