ঢাকা, ২৬ জানুয়ারি – সোমবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা (UHC) সংক্রান্ত অগ্রগতি পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই আলোচনাটি ইউনিসেফ, পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেটরি রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ইউএসসি ফোরামের যৌথ উদ্যোগে আয়োজন করা হয়। উপস্থিত প্রতিনিধিরা দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা ও উন্নয়নের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে মতবিনিময় করেন।
প্রতিবছর চিকিৎসা ব্যয়জনিত কারণে দেশের ৬১ লক্ষ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যায়। অর্থনৈতিক দিক থেকে এই পরিমাণের প্রভাব স্বাস্থ্য সেবার ন্যায্যতা ও টেকসইতা প্রশ্নবিদ্ধ করে। একই সঙ্গে, দেশের অর্ধেকেরও বেশি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান রোগীর চাহিদা পূরণে যথাযথ প্রস্তুতি না থাকায় সেবা প্রদান সীমাবদ্ধ থাকে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) নির্ধারিত মান অনুযায়ী প্রতি ১০,০০০ জনের জন্য ৪৪.৫ জন স্বাস্থ্যকর্মী থাকা দরকার, যেখানে বাংলাদেশে এই অনুপাত মাত্র ৮.৩ জন। এই ঘাটতি দেশের স্বাস্থ্য সেবার গুণগত মান ও পৌঁছানোর ক্ষমতাকে প্রভাবিত করছে।
সেশনের প্রধান আলোচনাপয়েন্টগুলোর একটি ছিল রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি ও সমন্বিত নীতি ছাড়া স্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি সম্ভব নয়। উপস্থিত বিশেষজ্ঞরা সরকারকে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নমূলক পদক্ষেপে অগ্রাধিকার দিতে আহ্বান জানান।
অর্থনীতিবিদ ও পিপিআরসির নির্বাহী সভাপতি হোসেন জিল্লুর রহমান উল্লেখ করেন, স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নের জন্য শূন্য থেকে শুরু করার দরকার নেই; কিছু ক্ষেত্রে ইতিমধ্যে অগ্রগতি দেখা গেছে, তবে কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি স্থবির বা ঘাটতি রয়ে গেছে। তিনি জোর দেন, শূন্য পদ পূরণ করা গতি বৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি।
ইউএসসি ফোরামের সদস্যসচিব মো. আমিনুল হাসান চারটি মূল সূচক – সেবার ব্যাপ্তি, আর্থিক সুরক্ষা, সেবা প্রতিষ্ঠানের প্রস্তুতি ও ন্যায্যতা – এ দেশের বর্তমান অবস্থা সন্তোষজনক নয় বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এই ক্ষেত্রগুলোতে উন্নতি না হলে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জন কঠিন হবে।
প্রতিবেশী দেশ ভারত ও শ্রীলঙ্কার স্বাস্থ্য সূচকগুলো বাংলাদেশে তুলনামূলকভাবে উন্নত। বিশেষ করে সেবার ব্যাপ্তি ও আর্থিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে এই দুই দেশের নীতি ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি বাংলাদেশের জন্য উদাহরণস্বরূপ বিবেচিত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞের মতে, গর্ভবতী নারীর মানসম্মত প্রসবপূর্ব সেবা বর্তমানে মাত্র ৪১ শতাংশ নারীই পাচ্ছেন। উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস রোগের চিকিৎসা যথাক্রমে ৩৪ শতাংশ ও ১৯ শতাংশ রোগীই গ্রহণ করতে পারছেন। এই সংখ্যা স্বাস্থ্যসেবার প্রবেশযোগ্যতা ও গুণগত মানের ঘাটতি নির্দেশ করে।
টিবি নিয়ন্ত্রণ ও টিকাদান কর্মসূচিতে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। ৯৮ শতাংশ শিশুকে সম্পূর্ণ টিকা দেওয়া হয়, আর টিবি রোগীর চিকিৎসা সাফল্যের হার ৯৫ শতাংশে পৌঁছেছে। এই অর্জনগুলো আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।
তবে, টিবি কর্মসূচিতে কিছু মিডিয়া সংস্থা দুর্নীতি ও পরিসংখ্যান জাল করার অভিযোগ তুলে ধরেছে। এই অভিযোগগুলো স্বাস্থ্য নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য অতিরিক্ত তদারকি প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে।
জনস্বাস্থ্যবিদ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ অধ্যাপক এম.এ. ফয়েজ জোর দিয়ে বলেন, ‘স্বাস্থ্যকর্মী’ শব্দের সংজ্ঞা স্পষ্ট না হলে কর্মী ঘাটতি নির্ণয় ও সমাধান করা কঠিন হবে। তিনি বেসরকারি সংস্থা এমিনেন্সের সঙ্গে সমন্বয় বাড়িয়ে সঠিক মানদণ্ড নির্ধারণের আহ্বান জানান।
সারসংক্ষেপে, স্বাস্থ্যসেবার গুণগত মান ও পৌঁছানোর ক্ষমতা বাড়াতে কর্মী ঘাটতি পূরণ, আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং সেবা প্রতিষ্ঠানের প্রস্তুতি উন্নত করা জরুরি। এই দিকগুলোতে সমন্বিত নীতি ও কার্যকর বাস্তবায়ন ছাড়া সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জন সম্ভব নয়। আপনার মতামত কী? দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে আপনি কোন পদক্ষেপকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন?



