মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যারিয়ার-শিপ ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ইরানের পার্শ্ববর্তী মধ্যপ্রাচ্যের জলে মোতায়েন করেছে, যা ইরানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও প্রতিবাদে প্রাণহানির নতুন তথ্য প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কমান্ড জানিয়েছে, এই পদক্ষেপ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে। একই সময়ে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটেছে।
আব্রাহাম লিংকন ক্যারিয়ার-শিপের সঙ্গে একটি নৌবহরও অঞ্চলে পাঠানো হয়েছে, যা পূর্বে পারস্য উপসাগরে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর অংশ হিসেবে বিবেচিত। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সূত্র অনুযায়ী, নৌবহরটি বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের জলে সক্রিয় অবস্থায় রয়েছে এবং প্রয়োজনমতো অতিরিক্ত শক ওয়েভ ক্ষমতা প্রদান করতে সক্ষম। এই মোতায়েনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উল্লেখ করে ছিলেন, যদি পরিস্থিতি খারাপ হয় তবে বৃহৎ সামরিক শক্তি পাঠানো হবে।
ইরানে প্রতিবাদমূলক আন্দোলন ডিসেম্বরের শেষ দিকে অর্থনৈতিক সংকট ও জীবনের ব্যয় বৃদ্ধির বিরোধে শুরু হয়। জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে এই প্রতিবাদগুলো সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয় এবং দ্রুত দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপত্তা বাহিনীর হস্তক্ষেপের ফলে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে, যা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
একটি মানবাধিকার সংস্থা প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান চলাকালে অন্তত ৫,৮৪৮ জন নিহত হয়েছে। সংস্থাটি আরও জানায়, বিক্ষোভের সময় ৪১,০০০ এর বেশি মানুষ গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ইরান সরকার এই সংখ্যাকে অস্বীকার করে, তাদের মতে মোট ৩,১১৭ জন নিহত হয়েছে, যার বেশিরভাগই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য বা সহিংসতার শিকার সাধারণ নাগরিক। এই পার্থক্য আন্তর্জাতিক সংস্থার মধ্যে তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরিস্থিতি নিয়ে সতর্কতা জারি করে, কোনো সামরিক হস্তক্ষেপের জবাবে তারা ‘ব্যাপক ও অনুতাপজনক’ প্রতিক্রিয়া জানাবে বলে উল্লেখ করেছে। মন্ত্রণালয় জোর দিয়ে বলেছে, ইরান তার সামরিক সক্ষমতার ওপর সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাসী এবং প্রয়োজন হলে শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া দিতে প্রস্তুত। এই বিবৃতি অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিবেশকে আরও অস্থির করে তুলেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের কিছু সদস্য রাষ্ট্র ইরানের বিপ্লবী গার্ড (IRGC) কে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছে। যদিও ইউরোপীয় ইউনিয়নের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও রয়ে গেছে, তবে এই পদক্ষেপ ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক উত্তেজনাকে তীব্রতর করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা ইঙ্গিত দিয়েছেন, সন্ত্রাসী তালিকায় যুক্ত হওয়া ইরানের আর্থিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের উপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি পূর্বে পারস্য উপসাগরে বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে, বিশেষ করে ইরাক ও সিরিয়ার সংঘাতে। তবে এইবারের ক্যারিয়ার-শিপ মোতায়েন ইরানের অভ্যন্তরীণ অশান্তির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, যা পূর্বের নৌবহর মোতায়েনের তুলনায় ভিন্ন কৌশলগত লক্ষ্য নির্দেশ করে। বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ ইরানের নিরাপত্তা নীতি ও পারস্যের জ্বালানি রুটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি, ইরানের আন্তর্জাতিক অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করার উদ্দেশ্য বহন করে।
আঞ্চলিক দেশগুলোও এই উন্নয়নকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তুর্কি ও ইসরায়েলি কূটনীতিকরা ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং মার্কিন সামরিক উপস্থিতি উভয়ই তাদের নিরাপত্তা কৌশলে প্রভাব ফেলবে বলে সতর্ক করেছেন। একই সঙ্গে, রাশিয়া ও চীন ইরানের স্বায়ত্তশাসন রক্ষার পক্ষে তাদের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে, যা আন্তর্জাতিক মঞ্চে বহু-ধারার কূটনৈতিক টানাপোড়েনের ইঙ্গিত দেয়।
পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবহরের অবস্থান ও কার্যক্রমের বিষয়ে আরও স্পষ্টতা পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ডের মতে, ক্যারিয়ার-শিপের উপস্থিতি অস্থায়ী এবং পরিস্থিতি উন্নত না হলে তা বাড়িয়ে নেওয়া হতে পারে। ইরান সরকারও আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে মানবাধিকার সংস্থার তথ্যের বিরোধিতা করে, স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের প্রবেশের দাবি জানিয়েছে। এই দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনা সমাধানের জন্য কূটনৈতিক চ্যানেলগুলো পুনরায় সক্রিয় হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যারিয়ার-শিপ মোতায়েন এবং ইরানে বিক্ষোভের ফলে সৃষ্ট প্রাণহানি ও গ্রেপ্তার সংখ্যা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিবেশকে জটিল করে তুলেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সন্ত্রাসী তালিকা প্রস্তাব এবং মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান শক্তিগুলোর কূটনৈতিক মন্তব্যগুলো এই সংকটের সম্ভাব্য পরিণতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পরিস্থিতি কীভাবে বিকশিত হবে তা নির্ভর করবে উভয় পক্ষের কূটনৈতিক ইচ্ছা ও সামরিক কৌশলের সমন্বয়ের ওপর।



