যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টারমার মঙ্গলবার রাত থেকে চীনে ভ্রমণ করবেন, ২০১৮ সালের পর প্রথম ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর। এই সফরের মূল লক্ষ্য বাণিজ্যিক ও বিনিয়োগ সম্পর্ককে পুনরুজ্জীবিত করা, যদিও দু’দেশের মধ্যে মানবাধিকার, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং গোপনীয়তা সংক্রান্ত উদ্বেগ রয়ে গেছে। স্টারমার এই ভ্রমণকে যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক সংকটের মাঝেও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবে দেখছেন।
চীনে পৌঁছানোর পর স্টারমার শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন, যেখানে উভয় পক্ষের উদ্বেগের বিষয়গুলো আলোচনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে চীন সরকারকে সমালোচিত করা মানবাধিকার লঙ্ঘন, ইউক্রেনের যুদ্ধ এবং গোপনীয়তা সংক্রান্ত অভিযোগগুলো বৈঠকের সময় উত্থাপিত হতে পারে। এই আলোচনার মাধ্যমে উভয় দেশ বাণিজ্যিক সুযোগ-সুবিধা এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি সমন্বয় করার চেষ্টা করবে।
বৈঠকের পর স্টারমার শনিবার জাপানে সংক্ষিপ্ত সফর করবেন, টোকিওর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। জাপানে তার সফর সীমিত সময়ের জন্য নির্ধারিত, যেখানে দু’দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের বর্তমান অবস্থা ও পারস্পরিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হবে। এই দুই দেশের সঙ্গে একসাথে সফর স্টারমারের এশিয়ার কূটনৈতিক অগ্রাধিকারের অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
স্টারমারের মুখপাত্র সোমবার জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী মঙ্গলবার রাত থেকে চীন ও জাপান সফরে রওনা হবেন, তবে সফরের বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তিনি উল্লেখ করেছেন, এই সফরে বাণিজ্য ও বিনিয়োগসহ বিভিন্ন বিষয় আলোচনা হবে। তাই উভয় দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বিস্তৃত আলোচনার মাধ্যমে সম্পর্কের নতুন দিক উন্মোচিত হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
এই সফর যুক্তরাজ্যের চীন সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্স্থাপনের ইচ্ছা প্রকাশ করে, যেখানে বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে নতুন বাণিজ্যিক সুযোগের সন্ধান করা হচ্ছে। পূর্ববর্তী কনজারভেটিভ সরকারের সময় লন্ডন ও বেইজিংয়ের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটেছিল, যা স্টারমারের নতুন নীতি পরিবর্তনের সূচক।
স্টারমারের চীন সফরের ঘোষণা আসছে লন্ডনে পরিকল্পিত “মেগা-এম্বেসি” প্রকল্পের অনুমোদনের এক সপ্তাহের মধ্যে। এই প্রকল্পটি ২০,০০০ বর্গমিটার এলাকা জুড়ে গড়ে তোলা হবে, যা যুক্তরাজ্যের সর্ববৃহৎ দূতাবাস কমপ্লেক্স হিসেবে গড়ে উঠবে এবং পশ্চিমা রাজধানীর মধ্যে অন্যতম বৃহৎ হবে।
প্রকল্পটি স্থানীয় বাসিন্দা ও মানবাধিকার গোষ্ঠীর কাছ থেকে তীব্র বিরোধের মুখে রয়েছে। প্রতিবাদকারীরা উল্লেখ করেছেন, ঐতিহাসিক রয়্যাল মিন্টের পাশে অবস্থিত এই বিশাল ভবনটি গোপনীয়তা লঙ্ঘন এবং বিরোধী মতামত দমন করার সম্ভাবনা রাখে। ফলে আইনি চ্যালেঞ্জ এবং প্রতিবাদী কর্মসূচি চালু হয়েছে।
স্টারমার গত মাসে স্বীকার করেছেন, চীন যুক্তরাজ্যের জন্য বড় অর্থনৈতিক সুযোগ প্রদান করে, তবে একই সঙ্গে “বাস্তব জাতীয় নিরাপত্তা হুমকি”ও সৃষ্টি করে। তিনি উল্লেখ করেছেন, বাণিজ্যিক স্বার্থ ও নিরাপত্তা উদ্বেগের মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখা জরুরি। এই মন্তব্যের পর থেকে নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে।
অধিকন্তু, লন্ডনের মেগা-এম্বেসি স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে সক্রিয় প্রতিবাদকারী গোষ্ঠী উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, যে এই বিশাল কাঠামোটি বিরোধী কণ্ঠস্বরের ওপর নজরদারি ও গোপনীয়তা লঙ্ঘনের হাতিয়ার হতে পারে। তারা ঐতিহাসিক রয়্যাল মিন্টের কাছাকাছি অবস্থিত এই স্থাপনা নিয়ে আইনগত পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছে।
যুক্তরাজ্যের সরকার বলেছে, গোপনীয়তা ঝুঁকি মোকাবিলায় গোয়েন্দা সংস্থাগুলি বিস্তৃত ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। একই সঙ্গে চীন সরকার তার লন্ডনের সাতটি বিদ্যমান দূতাবাসকে একত্রিত করে একক স্থানে স্থানান্তর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা নিরাপত্তা উদ্বেগ কমাতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
স্টারমারের চীন ও জাপান সফর উভয় দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের নতুন দিক উন্মোচনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। পরবর্তী পর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে বাণিজ্যিক চুক্তি, বিনিয়োগ প্রকল্প এবং নিরাপত্তা সমন্বয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা প্রত্যাশিত। এই আলোচনার ফলাফল যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং চীন সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্বের ভবিষ্যৎ গঠন করবে।



