কিং পেঙ্গুইন, কোয়ালা, এশীয় হাতি এবং উত্তর লম্বা কানযুক্ত বাদুড়ের মতো সংবেদনশীল প্রজাতিগুলোর রোগ প্রতিরোধে টিকাদান এখন গবেষকদের প্রধান লক্ষ্য। ২০২৪ সালে ক্রোজেট দ্বীপপুঞ্জে একটি মারাত্মক পাখির ইনফ্লুয়েঞ্জা স্ট্রেইন প্রবেশের পর, দক্ষিণী হাতি সীলের শাবকরা প্রথম শিকার হয়ে মারা যায়। তবে একই সময়ে, কিছু পেঙ্গুইন শাবক ইতিমধ্যে ফ্লু টিকা পেয়েছিল, যা তাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।
ফ্রান্সের মন্টপেলিয়েরের সেন্টার দে’ইকোলজি ফাংশনেল এভোলিউটিভের রোগবিজ্ঞানী থিয়েরি বুলিনিয়ের এবং তার দল ক্রোজেটের পসেশন দ্বীপে যুবক কিং পেঙ্গুইনের ওপর একটি ছোট টিকাদান পরীক্ষা চালাচ্ছিল। অক্টোবর মাসে হ্যাঁচি H5N1 ভাইরাসের বিস্তার এবং তার ফলে বাল্ড ঈগল ও লাল শিয়ালসহ বিভিন্ন পাখি ও স্তন্যপায়ী প্রাণীর মৃত্যু এই পরীক্ষার ত্বরান্বিত করার প্রধান কারণ ছিল। গবেষকরা বিশ্বাস করেন, উত্তর রকহপার পেঙ্গুইন বা আমস্টারডাম আলবাট্রসের মতো দুর্লভ পাখিদের টিকাদান করলে তারা একই ভাইরাস থেকে রক্ষা পাবে।
এই প্রকল্পটি বন্যপ্রাণীর সংরক্ষণে টিকাদানের সম্ভাবনা যাচাইকারী একাধিক উদ্যোগের মধ্যে একটি। একই বছর সেপ্টেম্বর মাসে অস্ট্রেলিয়ার সরকার বন্য কোয়ালাদের জন্য ক্ল্যামিডিয়া টিকাদান অনুমোদন করে, যা রোগের বিস্তার রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এছাড়া, আফ্রিকান হাতির রক্তক্ষরণজনিত হেমোরেজিক রোগের কারণ হের্পিসভাইরাসের বিরুদ্ধে টিকাদান কিছু চিড়িয়াখানায় ইতিবাচক ফলাফল দেখিয়েছে।
পশ্চিম যুক্তরাষ্ট্রে গবেষকরা সাদা নাকের সিনড্রোম নামে পরিচিত ফাঙ্গাল রোগের বিরুদ্ধে বাদুড়ের টিকাদান চালাচ্ছেন। এই রোগ পূর্বে লক্ষ লক্ষ বাদুড়ের মৃত্যু ঘটিয়েছে, তবে টিকাদান প্রোগ্রাম শুরু হওয়ার পর রোগের বিস্তার ধীর হয়েছে। টিকাদানকে সংরক্ষণমূলক সরঞ্জাম হিসেবে ব্যবহার করা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওয়াইল্ডলাইফ হেলথ সেন্টারের বন্যপ্রাণী জীববিজ্ঞানী টনি রক বলেন, টিকাদান বন্যপ্রাণীর স্বাস্থ্য রক্ষা ও প্রজাতির টিকে থাকা নিশ্চিত করার জন্য অপরিহার্য।
বন্যপ্রাণীর রোগ নিয়ন্ত্রণে টিকাদানকে এক নতুন কৌশল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, কারণ প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতি প্রায়শই দূরবর্তী ও কঠিন পরিবেশে কার্যকর হয় না। টিকাদান প্রোগ্রামগুলোকে সফল করতে প্রজাতির স্বাভাবিক বাসস্থান, টিকার নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদী ইমিউনিটি নিশ্চিত করা জরুরি।
ক্রোজেট দ্বীপে হ্যাঁচি H5N1 এর বিস্তার দেখায় যে, পাখি ও স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে রোগের স্থানান্তর কত দ্রুত ঘটতে পারে। তাই, টিকাদানকে দ্রুত এবং ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করা হলে ভবিষ্যতে এমন মহামারী প্রতিরোধে সহায়তা করবে। গবেষকরা উল্লেখ করেন, টিকাদান শুধুমাত্র একক প্রজাতির জন্য নয়, পুরো ইকোসিস্টেমের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
অস্ট্রেলিয়ার কোয়ালা টিকাদান প্রকল্পের অনুমোদন একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, কারণ কোয়ালা জনসংখ্যা দীর্ঘদিন ধরে ক্ল্যামিডিয়া সংক্রমণে হ্রাস পাচ্ছিল। টিকাদান শুরু হওয়ার পর, রোগের নতুন কেসে উল্লেখযোগ্য হ্রাস দেখা গেছে, যা প্রজাতির পুনরুদ্ধারে ইতিবাচক দিক নির্দেশ করে।
হাতির হের্পিসভাইরাস টিকাদান পরীক্ষায় দেখা গেছে, টিকাপ্রাপ্ত হাতিরা রোগের লক্ষণ কম দেখায় এবং বেঁচে থাকার হার বৃদ্ধি পায়। যদিও এই টিকা এখনো সীমিত সংখ্যক চিড়িয়াখানায় ব্যবহৃত হচ্ছে, তবে ভবিষ্যতে বন্য হাতির জনসংখ্যায় এটি বিস্তৃত করা পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
বাদুড়ের সাদা নাকের সিনড্রোমের বিরুদ্ধে টিকাদান প্রোগ্রামটি যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি রাজ্যে চালু হয়েছে। টিকাপ্রাপ্ত বাদুড়ের মধ্যে রোগের প্রাদুর্ভাব কমে গেছে এবং প্রজনন সাফল্য বাড়েছে। গবেষকরা আশা করেন, এই পদ্ধতি অন্যান্য ফাঙ্গাল রোগের বিরুদ্ধেও কার্যকর হতে পারে।
বন্যপ্রাণীর টিকাদান প্রকল্পগুলোতে বিজ্ঞানী, সংরক্ষণ সংস্থা এবং সরকারী সংস্থার সমন্বিত কাজ প্রয়োজন। টিকার উৎপাদন, বিতরণ এবং পর্যবেক্ষণ সবই সঠিকভাবে পরিচালনা করা হলে প্রজাতির টিকে থাকা নিশ্চিত করা সম্ভব।
সামগ্রিকভাবে, টিকাদানকে বন্যপ্রাণীর রোগ প্রতিরোধে একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে স্বীকৃতি বাড়ছে। বিভিন্ন প্রজাতিতে ইতিমধ্যে ইতিবাচক ফলাফল দেখা গেছে, যা ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত টিকাদান উদ্যোগের ভিত্তি তৈরি করবে। সংরক্ষণকর্মীরা এখন প্রশ্ন তুলছেন, কীভাবে এই সাফল্যকে বিশ্বব্যাপী বন্যপ্রাণীর রক্ষায় আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়।



