অন্তর্বর্তী সরকার চট্টগ্রাম বিভাগের দুটো স্থানে নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের অনুমোদন জানিয়েছে। সরকারী সিদ্ধান্তে আনোয়ারায় ৬০০ একর জমিতে ফ্রি ট্রেড জোন এবং মিরসরাইয়ে ৮৫০ একর জমিতে ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন স্থাপন করা হবে। এই ঘোষণা বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (BIDA) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক বিন হারুনের প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রকাশ পায়।
অনুমোদনটি বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) চতুর্থ গভর্নিং বোর্ড সভায় নেওয়া হয়। সভার সভাপতিত্ব করেন বেজা গভর্নিং বোর্ডের চেয়ারম্যান ও প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। সভায় গৃহীত নীতি অনুযায়ী উল্লিখিত দুইটি জোনের সীমানা ও কার্যক্রমের কাঠামো চূড়ান্ত করা হবে।
চৌধুরী আশিক বিন হারুন উল্লেখ করেন, আনোয়ারায় নির্ধারিত ৬০০ একর জমিতে ফ্রি ট্রেড জোন গঠন করা হবে, যেখানে রপ্তানি-নির্ভর শিল্প ও সেবা খাতের জন্য বিশেষ সুবিধা প্রদান করা হবে। মিরসরাইয়ে ৮৫০ একর জমিতে ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন স্থাপন করা হবে, যা দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পের স্বয়ংসম্পূর্ণতা বাড়াতে সহায়তা করবে। পূর্বে এই স্থানে একটি ইন্ডিয়ান ইকোনমিক জোনের পরিকল্পনা ছিল, তবে তা বাদ দেওয়া হয়েছে।
বিডা চেয়ারম্যানের মতে, বর্তমানে বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে এবং এ দেশগুলোই নতুন জোনে বিনিয়োগের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। চুক্তি চূড়ান্তের পর্যায়ে পৌঁছালে সরকার সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই মন্তব্যের পর প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম উপস্থিত ছিলেন।
ফ্রি ট্রেড জোনের অনুমোদন দেশের রপ্তানি কাঠামোকে বৈচিত্র্যপূর্ণ করার সম্ভাবনা তৈরি করে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও কর সুবিধা প্রদান করা হবে। ফলে রপ্তানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমে যাওয়ার আশা করা যায়।
ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনের লক্ষ্য দেশীয় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনের পরিসর বাড়ানো এবং প্রযুক্তি স্থানান্তর ত্বরান্বিত করা। জোনের মধ্যে উৎপাদন, গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা হবে, যা স্থানীয় সরবরাহ শৃঙ্খলকে শক্তিশালী করবে। এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে বিদেশি সরঞ্জাম ও উপাদানের উপর নির্ভরতা হ্রাস পাবে।
উভয় জোনের প্রতিষ্ঠা চট্টগ্রাম অঞ্চলের অর্থনৈতিক গতিবিধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। নতুন শিল্প পার্ক ও লজিস্টিক সেন্টার গড়ে ওঠার ফলে স্থানীয় ব্যবসা ও সেবা খাতের চাহিদা বৃদ্ধি পাবে। ফলে আঞ্চলিক কর্মসংস্থানও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
প্রকল্পের বাস্তবায়ন পর্যায়ে কিছু ঝুঁকি বিদ্যমান। বিনিয়োগ চুক্তি চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত সময়সীমা ও শর্তাবলী পরিবর্তিত হতে পারে। তাছাড়া, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিবেশের পরিবর্তনও প্রকল্পের অগ্রগতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে সরকার ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও নীতি কাঠামো তৈরি করেছে, যা প্রকল্পের দ্রুত বাস্তবায়নে সহায়তা করবে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো জোনের অবকাঠামো নির্মাণ, ভূমি অধিগ্রহণ এবং নিয়ন্ত্রক অনুমোদন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার পরিকল্পনা করেছে। এই পদক্ষেপগুলো বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদে ফ্রি ট্রেড জোন এবং ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন উভয়ই দেশের শিল্প ভিত্তি শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। রপ্তানি বৃদ্ধি, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখবে। সরকার এই উদ্যোগকে দেশের শিল্পায়ন কৌশলের মূল স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করছে।
সারসংক্ষেপে, চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও মিরসরাইয়ে নতুন অর্থনৈতিক জোনের অনুমোদন দেশের বিনিয়োগ পরিবেশকে উন্নত করার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। ভবিষ্যতে চুক্তি স্বাক্ষর ও প্রকল্প বাস্তবায়ন দ্রুততর হলে, এই জোনগুলো দেশের বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।



