সোমবার, ২৬ জানুয়ারি, ঢাকা শহরে অনুষ্ঠিত “বন্ড মার্কেট ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ : চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড রিকমেনডেশন” শীর্ষক সেমিনারে অর্থসচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার সরকারী পরিকল্পনা প্রকাশ করেন। তিনি জানিয়েছেন, সঞ্চয়পত্রের ক্রয় সীমা বর্তমানের তুলনায় বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে মূল লক্ষ্য হল বন্ড বাজারের তরলতা বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ সহজতর করা। সীমা তুলে দিলে সাধারণ নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানগুলো বড় পরিমাণে সঞ্চয়পত্র কিনতে পারবে, যা বাজারের গভীরতা বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সেমিনারে উপস্থিত বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরও বন্ড লেনদেনের সহজীকরণে গুরুত্বারোপ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, যদি লেনদেন প্রক্রিয়া সরল হয়, তবে দেশের বন্ড বাজারের আকার প্রায় ৬ ট্রিলিয়ন টাকার বেশি বৃদ্ধি পেতে পারে।
মনসুরের মতে, বৃহৎ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো আর ব্যাংকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল থাকবে না, বরং সরাসরি বন্ড বাজারে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহের বিকল্প পাবে। এভাবে আর্থিক ব্যবস্থার বহুমুখিতা নিশ্চিত হবে।
বন্ড বাজারের সম্প্রসারণের জন্য বিদেশি বিনিয়োগের আহ্বানও করা হয়েছে। মনসুর উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে বাজারের স্বচ্ছতা ও নিয়মাবলী উন্নত করা প্রয়োজন, যাতে তারা বাংলাদেশে বন্ডের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী সম্পদ বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হয়।
অধিকন্তু, তিনি জোর দিয়ে বলেন, বন্ড বাজারের ভবিষ্যৎ মূলত মূল্যস্ফীতি এবং সুদের হারের গতিবিধির উপর নির্ভরশীল। মুদ্রাস্ফীতি কমলে এবং সুদের হার স্থিতিশীল হলে বাজারের টেকসইতা নিশ্চিত হবে।
একক সুদের হারের প্রয়োগের কথাও আলোচনায় উঠে আসে। মনসুরের ধারণা, যদি বন্ডের সুদের হার একরূপ করা যায়, তবে বিনিয়োগকারীর জন্য ঝুঁকি কমে এবং বাজারের আকর্ষণ বাড়ে। এই নীতি দীর্ঘমেয়াদে বন্ডের চাহিদা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
অর্থসচিবের মন্তব্যের সঙ্গে সঙ্গে, সরকারী সূত্রে জানানো হয়েছে যে সঞ্চয়পত্রের সীমা বাড়ানোর প্রস্তাবটি এখনো চূড়ান্ত নয়; এটি বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের মতামত সংগ্রহের পর সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে।
বাজার বিশ্লেষকরা এই পরিবর্তনকে ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখছেন। সীমা বাড়লে ছোট ও মাঝারি আকারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোও বন্ডের মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহ করতে পারবে, যা উৎপাদন ও রপ্তানি খাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে, বন্ড বাজারের দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে নিয়ন্ত্রক কাঠামোর শক্তিশালীকরণও প্রয়োজন হবে। তহবিলের নিরাপত্তা, লিকুইডিটি এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে নতুন নীতি ও তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
সামগ্রিকভাবে, সঞ্চয়পত্রের ক্রয় সীমা তুলে দেওয়া এবং বন্ড লেনদেনের সহজীকরণ দুটোই বাংলাদেশ সরকারের আর্থিক বাজারকে আধুনিকায়নের অংশ। এই পদক্ষেপগুলো যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে দেশীয় সঞ্চয়কে উৎপাদনশীল সম্পদে রূপান্তরিত করে অর্থনৈতিক বৃদ্ধিতে অবদান রাখতে পারে।
অবশেষে, সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক উভয়ই জোর দিয়ে বলেছেন, বন্ড বাজারের টেকসই উন্নয়নের জন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সুদের হার স্থিতিশীল রাখা অপরিহার্য। এই নীতিগুলো সঠিকভাবে অনুসরণ করলে, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীর আস্থা বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হবে।



