ফিলিপাইনের দক্ষিণে অবস্থিত বাসিলান প্রদেশে সোমবার ভোরবেলায় একটি যাত্রীবোঝাই ফেরি ডুবে ১৫ জনের দেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং অন্তত ৪৩ জন এখনও অজানা। ঘটনাটি বাসিলানের জাম্বোয়াঙ্গা শহর থেকে মিন্দানাও প্রদেশের জোলো দ্বীপের দিকে রওনা দেওয়া ‘ত্রিশা কেরস্টিন ৩’ নামের নৌকা কয়েক মিনিটের মধ্যেই ডুবে যাওয়ায় ঘটেছে।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানায়, ডুবে যাওয়ার মুহূর্তে ফেরিটিতে মোট ৩৩২ জন যাত্রী এবং ২৭ জন ক্রু সদস্য ছিলেন। ডুবের পর থেকে উদ্ধারকাজে কোস্টগার্ডের ডাইভার ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দপ্তরের দল সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। এখন পর্যন্ত ১৫ জনের দেহ উদ্ধার করা হয়েছে, আর ১৩৮ জনকে নিরাপদে তাড়া করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৮ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
বসিলান মেয়র আরসিনা লাজা কাথিং নানোহ এবং ফিলিপাইন কোস্টগার্ডের বাসিলান শাখার প্রধান এই ঘটনাকে ‘দুঃখজনক’ বলে উল্লেখ করে, ডুবের সঠিক কারণ এখনও নির্ধারিত হয়নি। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দপ্তরের মুখপাত্র রোনালিন পেরেজ এএফপি জানান, “আমরা এখন পর্যন্ত ১৩৮ জনকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করতে পেরেছি। তাদের মধ্যে ১৮ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে।” তিনি আরও যোগ করেন, “উদ্ধার তৎপরতা বাড়াতে মিন্দানাও প্রাদেশিক প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে এবং এই মুহূর্তে আমাদের কর্মীসংকট রয়েছে।”
ডুবের কারণ সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট তথ্য না থাকলেও, বিশ্লেষকরা বলছেন যে অতিরিক্ত যাত্রীবহন, নৌকার পুরনো অবস্থা এবং দুর্বল নিরাপত্তা মান এই ধরনের দুর্ঘটনার পেছনে থাকতে পারে। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ রমেশ চৌধুরী উল্লেখ করেন, “দক্ষিণ এশিয়ার বহু দেশে নৌযান নিরাপত্তা বিধি যথেষ্ট কঠোর না হওয়ায় এমন ঘটনা পুনরাবৃত্তি হতে পারে।” তিনি অতিরিক্তভাবে জোর দেন যে, স্থানীয় সরকার ও কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষকে নৌযানের রক্ষণাবেক্ষণ ও যাত্রীসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারি করতে হবে।
এই দুর্ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে ভূমধ্যসাগরে নৌকা ডুবের পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, যেখানে শরণার্থী ও অভিবাসী বহনকারী নৌকাগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে লিবিয়ার উপকূলে ১৮ জনের মৃত্যু ঘটেছিল এবং একই সময়ে ভূমধ্যসাগরে ১৮ জনের দেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। এসব ঘটনার সঙ্গে তুলনা করে, ফিলিপাইনের এই দুর্ঘটনা আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও মানবিক সংকটের নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ফিলিপাইন সরকার ঘটনাটির পর দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে, আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা ও প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল (APEC) এর সদস্য দেশগুলোর প্রতিনিধিরা এই ধরনের নৌযান দুর্ঘটনা রোধে সমন্বিত নীতি গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের ফিলিপাইনের দূতাবাসের মুখপাত্র উল্লেখ করেছেন, “আমরা ফিলিপাইন সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে বেঁচে থাকা যাত্রীদের দ্রুত চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে প্রস্তুত।”
অঞ্চলীয় নিরাপত্তা দৃষ্টিকোণ থেকে, বাসিলান ও মিন্দানাও প্রদেশের মধ্যে চলাচলকারী নৌযানগুলো প্রায়শই সশস্ত্র গোষ্ঠীর কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থাকে, যা নৌযানের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। তাই, নিরাপত্তা বাহিনীর তত্ত্বাবধান ও নৌযান পরিচালনার মানদণ্ডকে শক্তিশালী করা জরুরি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডুবের পরপরই ফিলিপাইন কোস্টগার্ড ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দপ্তরের দল জোলো দ্বীপে পৌঁছে উদ্ধার কাজ শুরু করে। তারা রেডি-টু-ইউজ ডাইভিং সরঞ্জাম, হেলিকপ্টার ও রেসকিউ বোট ব্যবহার করে ডুবে যাওয়া নৌকার নিচে অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে ৪৩ জনের অচেনা অবস্থার কারণে পরিবারগুলো উদ্বেগে ভুগছে, এবং সরকার পরিবারগুলোর জন্য মানসিক সহায়তা ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করার পরিকল্পনা করেছে।
এই ঘটনার পর, ফিলিপাইন সরকার নৌযান নিরাপত্তা সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন দ্রুততর করার কথা ঘোষণা করেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও প্রতিবেশী দেশগুলোর সমর্থন নিয়ে, দেশের নৌপরিবহন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা মান উন্নত করার জন্য নতুন নীতি গড়ে তোলার কাজ চলছে। ভবিষ্যতে নৌযানের যাত্রীসংখ্যা সীমা নির্ধারণ, রক্ষণাবেক্ষণ চেকলিস্ট এবং জরুরি প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম বাধ্যতামূলক করা হবে বলে আশা করা যায়।
এই দুর্ঘটনা ফিলিপাইনের নৌপরিবহন নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করেছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে ভবিষ্যতে এমন দুঃখজনক ঘটনা রোধ করা সম্ভব হবে, এটাই সকলের প্রত্যাশা।



