মোগল শাসক ২৬ জানুয়ারি ১৬৬৬-এ চট্টগ্রাম শহরকে পুনরায় নিজের হাতে নেয়, যা পূর্বে আরাকান রাজ্যের অধীনে ছিল। দীর্ঘ সময়ের পর এই বিজয় মোগল সাম্রাজ্যের পূর্ব সীমান্তকে স্থিতিশীল করে এবং আরাকান শাসনের সমাপ্তি চিহ্নিত করে।
চট্টগ্রাম প্রাচীনকালে বাংলার প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত ছিল এবং শতাব্দী ধরে বিভিন্ন জাতির বাণিজ্যিক মিলনস্থল ছিল। তবে ১৭শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলার সঙ্গে এর ঐতিহাসিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, ফলে শহরটি একাকী ও দুর্বল অবস্থায় পড়ে।
এই বিচ্ছিন্নতা আরাকান শাসনের অধীনে চট্টগ্রামকে পর্তুগিজ ও মাগ (মগ) জলদস্যুদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল করে তোলে। তারা সমুদ্র পথে লুটপাট চালিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদেরকে দাস হিসেবে বিক্রি করত।
বঙ্গের মোগল শাসনকালে রাজস্বের প্রধান উৎস ছিল বাংলার কর সংগ্রহ, যা সাম্রাজ্যের আর্থিক ভিত্তি গড়ে তুলত। তবে আরাকান-চট্টগ্রাম অঞ্চলে চলমান লুটপাট ও দাসবিক্রয় রাজস্ব সংগ্রহে বড় বাধা সৃষ্টি করছিল।
এই পরিস্থিতি সমাধানে ষষ্ঠ মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনকালে চট্টগ্রাম পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা গৃহীত হয়। তিনি মোগল সশস্ত্র বাহিনীর মাধ্যমে অঞ্চলটি পুনরায় দখল করার লক্ষ্যে একাধিক অভিযান চালান।
প্রথম দিকের প্রচেষ্টা ১৬শ শতকের শুরুর দিকে শুরু হয়, তবে প্রতিটি অভিযানই ব্যর্থ হয়। ১৬১৪ সালে মোগল সুবেদার কাসিম খান চিশতি নামের এক অভিযানের পরেও চট্টগ্রাম দখল করা সম্ভব হয়নি।
বছরের পর বছর মোগল সেনা আরাকান-চট্টগ্রামের জটিল ভূখণ্ড ও জলদস্যুদের প্রতিরোধে সংগ্রাম করে। শেষ পর্যন্ত মীরজুমলা (মির জুমলা) নামের মোগল জেনারেলকে এই কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
মীরজুমলা ১৬৬৬ সালে চট্টগ্রাম দখলের জন্য বিশাল সেনাবাহিনী গঠন করে এবং ২৬ জানুয়ারি এক তীব্র যুদ্ধের পর শহরের গেট ও দুর্গ দখল করে। এই বিজয় আরাকান শাসনের শেষের সূচনা করে এবং মোগল শাসনকে দৃঢ় করে।
চট্টগ্রাম বিজয়ের বিশদ বিবরণ ‘ফতহিয়া-ই-ইবরিয়া’ নামের দুই খণ্ডের গ্রন্থে লিপিবদ্ধ হয়েছে। এই গ্রন্থের রচয়িতা ইবনে মুহম্মদ ওয়ালী, যিনি শিহাব উদ্দিন তালিশ নামেও পরিচিত, মীরজুমলার মুনশি (কারানি) ছিলেন।
শিহাব উদ্দিন তালিশ মীরজুমলার বিভিন্ন অভিযানের রেকর্ড সংরক্ষণে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন এবং চট্টগ্রাম বিজয়ের ঘটনাও তার রচনায় অন্তর্ভুক্ত করেন। তার রচনাকে ‘তারিখ-ই আসাম’ নামেও চেনা যায়।
‘ফতহিয়া-ই-ইবরিয়া’ গ্রন্থের চট্টগ্রাম বিজয়ের অংশ বহু বছর অপ্রকাশিত রইল। বিশ শতকের প্রথম দশকে স্যার যদুনাথ সরকার অক্সফোর্ডের বডলিয়ান লাইব্রেরিতে এই অংশটি আবিষ্কার করেন এবং তা প্রকাশের পথে আনা হয়।
এই ঐতিহাসিক নথি অনুসারে চট্টগ্রাম পুনরুদ্ধার মোগল সাম্রাজ্যের পূর্ব সীমান্তকে সুরক্ষিত করে এবং আরাকান শাসনের শেষ চিহ্নিত করে। একই সঙ্গে সমুদ্র পথে চলমান পর্তুগিজ ও মাগ জলদস্যুদের কার্যক্রমও ধীরে ধীরে হ্রাস পায়।
চট্টগ্রাম পুনরায় মোগল শাসনে যুক্ত হওয়ায় বাঙ্গালিরা আরাকান শাসনের শোষণ থেকে মুক্তি পায় এবং অঞ্চলটি বাঙালি বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কে পুনরায় সংযুক্ত হয়।
বিপুল আয় ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ায় মোগল শাসনকালে চট্টগ্রাম একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও সামরিক ঘাঁটি হিসেবে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়, যা পরবর্তী সময়ে বাংলার সমৃদ্ধি ও সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।



