টোকিওর উয়েনো চিড়িয়াখানা থেকে চীনের শেনঝেনে যমজ পান্ডা শাও শাও ও লেই লেই প্রস্থান করবে, যা প্রায় ৫৩ বছর পর জাপানে পান্ডা অনুপস্থিতির সূচনা করে। টোকিও মহানগর সরকার রবিবার এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। দুজনই ২০২১ সালে উয়েনোতে জন্ম নেওয়া, এবং আজই তাদের শেষ জনসাধারণের প্রদর্শনী সম্পন্ন হয়েছে। এই পদক্ষেপটি চীন-জাপান কূটনৈতিক চুক্তির শর্ত অনুসারে নেওয়া হয়েছে।
উয়েনো চিড়িয়াখানা ১৯৭২ সাল থেকে চীনের সঙ্গে পান্ডা ধার‑দানের চুক্তি বজায় রাখছে, যেখানে প্রতিটি প্রাণীর জন্য নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফেরত দেওয়ার শর্ত যুক্ত। চীনের সঙ্গে করা ঋণচুক্তি অনুযায়ী, জাপানে জন্ম নেওয়া পান্ডা চার বছর পূর্ণ হওয়ার আগে চীনে ফেরত দিতে হবে। এই শর্তের ভিত্তিতে শাও শাও ও লেই লেইকে শেনঝেনে পাঠানো হচ্ছে। চুক্তির ধারাগুলি উভয় দেশের সংরক্ষণ নীতি ও কূটনৈতিক সম্পর্ককে সমর্থন করে।
শাও শাও ও লেই লেই উয়েনোতে ২০২১ সালের বসন্তে জন্ম নেয়, এবং দ্রুত দর্শকদের প্রিয় হয়ে ওঠে। তাদের জন্মের পর মাত্র কয়েক মাসে তারা টোকিওবাসীর হৃদয়ে বিশেষ স্থান অর্জন করে, সামাজিক মিডিয়ায় বিশাল সাড়া পায়। যদিও লালন‑পালন জাপানে সম্পন্ন হয়েছে, চীনের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী তাদের বয়স চার বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই ফেরত দিতে হবে। তাই ২০২৫ সালের শীতকালে তাদের চীনে রওনা নিশ্চিত করা হয়েছে।
টোকিও মহানগর কর্তৃপক্ষের মতে, আজ শাও শাও ও লেই লেইকে জনসাধারণের জন্য শেষবার প্রদর্শন করা হয়েছে। দর্শকরা শেষ মুহূর্তে ক্যামেরা তোলার জন্য লাইন গড়ে তুলেছিল, এবং চিড়িয়াখানার কর্মীরা বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। প্রদর্শনী শেষে প্রাণীগুলোকে চীনের পরিবহন দল গ্রহণ করেছে। রওনা প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক শিপিং মান অনুসরণ করা হয়েছে।
যমজ পান্ডার বাবা-মা শিন শিন ও রি রি ২০১১ সালে চীন থেকে জাপানে প্রজনন গবেষণার উদ্দেশ্যে আনা হয়েছিল। তারা পাঁচ বছর ধরে উয়েনোতে বাস করে, এবং শাও শাও ও লেই লেইর জন্মের পর গবেষণার লক্ষ্য অর্জন করে। গত বছর শিন শিন ও রি রি চীনে ফেরত পাঠানো হয়, ফলে শাও শাও ও লেই লেইর ফিরে যাওয়া জাপানে আর কোনো পান্ডা না থাকায় প্রথমবারের মতো পান্ডা‑শূন্য অবস্থা তৈরি করবে। এই ঘটনা প্রায় অর্ধশতাব্দীর মধ্যে প্রথম।
মিনোরু কিহারা, জাপানের মন্ত্রিপরিষদের মুখ্য সচিব, উল্লেখ করেছেন যে পান্ডা জাপানের মানুষের জন্য দীর্ঘদিনের ভালোবাসার প্রতীক এবং কূটনৈতিক সেতু হিসেবে কাজ করেছে। তিনি যোগ করেছেন, চীন‑জাপান সম্পর্কের বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে পান্ডা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এবং ভবিষ্যতেও এই বন্ধন বজায় থাকবে বলে আশা করা হয়। কিহারা আরও জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার ও অন্যান্য চিড়িয়াখানা নতুন পান্ডা আনার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অবনতি নতুন প্রাণী সংগ্রহের সম্ভাবনাকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।
স্থানীয় সরকারগুলো বিশেষ করে হোক্কাইডো ও কিয়োটোর চিড়িয়াখানা নতুন পান্ডা ধার‑দানের জন্য চীনের সঙ্গে আলোচনার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। তারা দাবি করে, পান্ডা পর্যটন আয় ও পরিবেশ শিক্ষা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে চীন‑জাপান কূটনৈতিক উত্তেজনা, বিশেষ করে সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও বাণিজ্য নীতির পার্থক্য, নতুন চুক্তি স্বাক্ষরের পথে বাধা সৃষ্টি করেছে। এই পরিস্থিতি ভবিষ্যতে পান্ডা‑ধার‑দানের শর্তাবলিকে কঠোর করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, পান্ডা‑শূন্য অবস্থা জাপানের প্রাণী সংরক্ষণ নীতি ও জনসাধারণের মনোভাবের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। উয়েনো চিড়িয়াখানা এখন নতুন সংরক্ষণ প্রকল্পে মনোযোগ দিচ্ছে, যেমন স্থানীয় বন্যপ্রাণী রক্ষা ও শিক্ষামূলক প্রোগ্রাম। তবে পান্ডার অনুপস্থিতি পর্যটন আয় হ্রাসের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলেছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সরকার ও চিড়িয়াখানা নতুন কৌশল গড়ে তুলতে হবে।
চীনের শেনঝেনে পৌঁছানোর পর শাও শাও ও লেই লেইকে নতুন বাসস্থানে স্থানান্তর করা হবে, যেখানে তারা চীনের জাতীয় সংরক্ষণ কেন্দ্রের তত্ত্বাবধানে থাকবে। সেখানে তারা প্রাকৃতিক পরিবেশে পুনরায় অভিযোজিত হবে এবং গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নমুনা সরবরাহ করবে। চীনের সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দুজনের স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে এবং তারা নিরাপদে পরিবেশে একীভূত হবে। এই প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক সংরক্ষণ মানদণ্ড অনুসরণ করে পরিচালিত হবে।
এই ঘটনাটি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে জাপান‑চীন সম্পর্কের সূক্ষ্ম পরিবর্তনের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। পান্ডা ধার‑দানের মাধ্যমে দুই দেশ দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব বজায় রেখেছে, তবে সাম্প্রতিক বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তা বিরোধ নতুন চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন করেছে। বিশ্লেষকরা অনুমান করেন, ভবিষ্যতে চীন‑জাপান কূটনৈতিক সংলাপ পুনরায় গড়ে তোলার সঙ্গে সঙ্গে প্রাণী ধার‑দানের শর্তও পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে। তাই এই পান্ডা‑প্রস্থান কেবল প্রাণী সংরক্ষণ নয়, দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির একটি সূচক হিসেবে বিবেচিত হবে।
সারসংক্ষেপে, শাও শাও ও লেই লেইর চীনে ফিরে যাওয়া জাপানে ৫৩ বছর পর প্রথম পান্ডা‑শূন্য অবস্থা তৈরি করবে, যা সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। উয়েনো চিড়িয়াখানা নতুন সংরক্ষণ প্রকল্পে মনোযোগ দিয়ে এই শূন্যতা পূরণ করার চেষ্টা করবে, আর সরকার কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে ভবিষ্যতে নতুন পান্ডা ধার‑দানের সম্ভাবনা অনুসন্ধান করবে। এই পরিবর্তনটি জাপান‑চীন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



