২০শ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক লেখক জর্জ অরওয়েল, তার জীবনের ঘটনাবলীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। ১৯৫০ সালে ৪৬ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করার পরেও, ১৯৪৫ সালে প্রকাশিত “অ্যানিমাল ফার্ম” এবং ১৯৪৯ সালে প্রকাশিত “নাইনটি-ইয়েটি-ফোর” তার আন্তর্জাতিক খ্যাতি বাড়িয়ে দেয়। এই দুই উপন্যাসে অরওয়েল স্টালিন, সোভিয়েত কমিউনিজম এবং সামগ্রিকতাবাদী শাসনের প্রতি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন, যা তাকে বহু পাঠকের চোখে অ্যান্টি-কমিউনিস্ট লেখক হিসেবে চিহ্নিত করে।
১৯৯০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরের প্রজন্মের একজন হিসেবে, আমি কলেজে প্রবেশের আগে বাংলায় “অ্যানিমাল ফার্ম”ের অনুবাদ পড়েছি। সেই সময়ের তরুণরা এই বইয়ের মাধ্যমে কমিউনিজমকে প্রধানত স্টালিনের সোভিয়েত শাসনের সঙ্গে যুক্ত করেছিল। একইভাবে “নাইনটি-ইয়েটি-ফোর”ও প্রথম প্রকাশের পর অধিকাংশ পাঠক এটিকে স্টালিনের সোভিয়েত কমিউনিজমের চিত্র হিসেবে গ্রহণ করে, যদিও বইটি মূলত নজরদারি, প্রচার এবং নাৎসি জার্মানির সাম্রাজ্যবাদী শাসনের বৈশিষ্ট্যগুলোকে তুলে ধরেছে।
অরওয়েলের লেখনীকে শুধুমাত্র অ্যান্টি-কমিউনিস্ট দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করা তার জীবনের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি উপেক্ষা করে। তার আত্মজীবনীমূলক প্রবন্ধ “Why I Write” (১৯৪৬) এ তিনি লেখকের কাজের চারটি মূল উদ্দেশ্য উল্লেখ করেন। প্রথমটি হল স্বার্থপরতা, যেখানে লেখক নিজের পরিচয় প্রকাশ এবং স্বীকৃতি লাভের জন্য লেখেন। দ্বিতীয়টি হল নান্দনিক আনন্দ, অর্থাৎ ভাষার সৌন্দর্য এবং বিশ্বের রূপকে প্রশংসা করার ইচ্ছা। তৃতীয়টি হল ঐতিহাসিক দায়িত্ব, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সত্যিকারের ঘটনা রেকর্ড করার প্রচেষ্টা। চতুর্থটি হল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, যেখানে তিনি জোর দিয়ে বলেন যে কোনো শিল্পকর্ম সম্পূর্ণভাবে রাজনীতির থেকে বিচ্ছিন্ন নয়; “শিল্পকে রাজনীতি থেকে আলাদা রাখতে হবে” এমন দাবি নিজেই একটি রাজনৈতিক অবস্থান।
অরওয়েলের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তার অ-কাল্পনিক রচনায় স্পষ্ট। তিনি জীবদ্দশায় সমাজতান্ত্রিক আদর্শের প্রতি দৃঢ়ভাবে অবিচল ছিলেন এবং তার শেষ দিন পর্যন্ত এই বিশ্বাস বজায় রেখেছেন। তার উপন্যাসগুলো যদিও স্টালিনের শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করে, তবু তা শুধুমাত্র একধরনের অ্যান্টি-কমিউনিজমের চেয়ে বেশি—এটি মানবিক স্বাধীনতা, সত্যের অনুসন্ধান এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে একটি বিস্তৃত নৈতিক আহ্বান।
শিক্ষা ক্ষেত্রে অরওয়েলের কাজের বিশ্লেষণ শিক্ষার্থীদের সমালোচনামূলক চিন্তাধারার বিকাশে সহায়তা করে। “অ্যানিমাল ফার্ম” এবং “নাইনটি-ইয়েটি-ফোর”কে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করলে শিক্ষার্থীরা ইতিহাস, রাজনীতি এবং সাহিত্যিক কৌশল একসাথে বিশ্লেষণ করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, শিক্ষার্থীরা উপন্যাসের চরিত্র ও ঘটনাকে ২০শ শতাব্দীর বাস্তব রাজনৈতিক ঘটনার সঙ্গে তুলনা করে দেখতে পারে, যা তাদের ঐতিহাসিক সচেতনতা বাড়ায়।
অরওয়েলের লেখার প্রেরণা সম্পর্কে জানলে শিক্ষার্থীরা নিজের লেখালেখি বা গবেষণার উদ্দেশ্য নির্ধারণে সহায়তা পাবে। স্বার্থপরতা, নান্দনিক আনন্দ, ঐতিহাসিক দায়িত্ব এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য—এই চারটি দিককে নিজের কাজের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা লেখার মান ও প্রভাব বাড়াতে পারে।
সারসংক্ষেপে, জর্জ অরওয়েলের সাহিত্যিক উত্তরাধিকার শুধুমাত্র অ্যান্টি-কমিউনিস্ট রূপে সীমাবদ্ধ নয়; তার কাজের মূল উদ্দেশ্য ছিল মানবিক মূল্যবোধ রক্ষা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারকে উৎসাহিত করা। শিক্ষার্থীরা এই দৃষ্টিকোণ থেকে অরওয়েলের রচনাকে পুনরায় মূল্যায়ন করলে ইতিহাসের বহুমাত্রিকতা ও সাহিত্যিক দায়িত্বের গভীরতা উপলব্ধি করতে পারবে।
**ব্যবহারিক টিপ:** আপনার পাঠ্যসূচিতে অরওয়েলের কোনো উপন্যাস অন্তর্ভুক্ত করলে, প্রথমে তার লেখার চারটি প্রেরণার মধ্যে কোনটি সবচেয়ে প্রভাবশালী তা চিহ্নিত করুন, তারপর সেই দিকটি ভিত্তি করে আলোচনা ও বিশ্লেষণ পরিচালনা করুন। এভাবে আপনি শুধু বইয়ের বিষয়বস্তু নয়, লেখকের উদ্দেশ্যও গভীরভাবে বুঝতে পারবেন।



