বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন রোববারের সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করেন, কর্ণফুলী টানেল, পায়রা বন্দর এবং পদ্মা সেতু সহ অযাচিত প্রকল্পগুলো বাংলাদেশ সরকারের আর্থিক দায় বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, এসব প্রকল্পে ব্যয়বহুল খরচের ফলে ১৫ বছরের মধ্যে মুদ্রার অবমূল্যায়ন প্রায় ৪৬ শতাংশে পৌঁছেছে।
এই আর্থিক চাপ মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে বড় পরিমাণে ঋণ নিতে হয়েছে, যা দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যে প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে চালের দামে পদ্মা সেতুর কারণে কেজিতে প্রায় ২০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে, এ বিষয়টি তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন।
শুক্রবার ১৯ জানুয়ারি নেত্রকোনায় একটি অনুষ্ঠানে তিনি এই মন্তব্য করেন, যেখানে তিনি উল্লেখ করেন যে ২০০৮ সালে সরকারী ঋণ ছিল দুই লাখ কোটি টাকা, আর বর্তমান সময়ে তা প্রায় বিশ তিন লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি। এই ঋণ বৃদ্ধি মূলত ব্যয়বহুল প্রকল্পের ফলে, যা কোনো আয় সৃষ্টিতে সহায়তা করেনি।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিভিন্ন সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন, যার মধ্যে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান এবং বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারপারসন এএইচ এম আহসান অন্তর্ভুক্ত। তারা রমজান মাসের নিকটবর্তী সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য ও বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করার জন্য টাস্কফোর্সের বৈঠক শেষ করে সংবাদ সম্মেলন পরিচালনা করেন।
শেখ বশিরউদ্দীন উল্লেখ করেন, বর্তমান সময়ে গ্যাস সরবরাহ, মুদ্রা বিনিময় হার এবং মার্কিন ডলারের কোনো সংকট নেই, যা বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক। তবে তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন মন্ত্রীরা এই আর্থিক পরিস্থিতিতে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট নির্মাণের মতো প্রকল্পে যুক্ত হচ্ছেন।
এ বিষয়ে তিনি বলেন, “সরকার এ ধরনের কোনো প্রকল্প নিয়েছে কি না, তা আমি জানি না,” এবং এ ধরনের ব্যয়কে অপ্রয়োজনীয় হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ঋণভিত্তিক ব্যয় দীর্ঘমেয়াদী দায় সৃষ্টি করেছে, যা ভবিষ্যতে আর্থিক স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হতে পারে।
বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বাজারের সরবরাহ পরিস্থিতি সম্পর্কে মন্তব্য করেন। তিনি জানান, কিছু পণ্যের সরবরাহ গত বছরের মতোই রয়েছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে সামান্য কমে গেছে। তবে তিনি আশাবাদী যে আসন্ন রমজানে বাজারের অবস্থা স্থিতিশীল থাকবে।
বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গ্যাসের সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে, যা উৎপাদন খাতে সরাসরি প্রভাব ফেলে। মুদ্রা বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা রপ্তানি-আমদানি ব্যবসায়িক লেনদেনকে সহজতর করে, ফলে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
শেখ বশিরউদ্দীন আরও উল্লেখ করেন, পদ্মা সেতুর নির্মাণে ব্যয়বহুল খরচের পাশাপাশি প্রকল্পের আর্থিক দায়ও বৃদ্ধি পেয়েছে, যা চালের দামের বৃদ্ধিতে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। তিনি বলেন, এই ধরনের অব্যবহৃত প্রকল্পের ফলে সরকারকে অতিরিক্ত ঋণ নিতে হয়েছে, যা ভবিষ্যতে আর্থিক নীতি প্রণয়নে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের টাস্কফোর্সের বৈঠকে উপস্থিত ব্যবসায়িক নেতারা বাজারের বর্তমান অবস্থা ও রমজান মাসে সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করেন। তারা উল্লেখ করেন, চালের দাম বৃদ্ধির ফলে গ্রাহকদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে, তবে গ্যাস ও মুদ্রা স্থিতিশীলতা এই প্রভাবকে কিছুটা কমিয়ে দিতে পারে।
বৈঠকের শেষে, সরকারী প্রতিনিধিরা রমজান মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে বিশেষ নজর দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। তারা উল্লেখ করেন, বাজার পর্যবেক্ষণ দল গঠন করে মূল্য হ্রাসের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
সারসংক্ষেপে, শীর্ষ কর্মকর্তারা একমত যে অযাচিত প্রকল্পের ব্যয়বহুলতা আর্থিক দায় বাড়িয়ে দিয়েছে, যা চালের দামের মতো মৌলিক পণ্যের মূল্যে প্রভাব ফেলেছে। তারা জোর দিয়ে বলেন, ভবিষ্যতে ব্যয়বহুল প্রকল্পে অতিরিক্ত ঋণ না নিয়ে আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা জরুরি।
এই পরিস্থিতিতে গ্যাস সরবরাহ, মুদ্রা বিনিময় হার এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ঋণ গ্রহণের প্রভাব বাজারে স্পষ্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারী দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, রমজান মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখতে সমন্বিত নীতি গ্রহণ করা হবে।
বাণিজ্য উপদেষ্টা এবং বাণিজ্য সচিবের মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, অযাচিত প্রকল্পের ব্যয়বহুলতা এবং ঋণ বৃদ্ধি দেশের আর্থিক স্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি। তাই, ভবিষ্যতে আর্থিক দায় কমাতে এবং বাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য কড়া আর্থিক শৃঙ্খলা প্রয়োজন।



