ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) রোববার প্রকাশিত একটি বিবৃতিতে জানিয়েছে, সরকার কর্তৃক প্রস্তাবিত সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা কার্যকর জবাবদিহি ছাড়া ঘুষ-দুর্নীতির নতুন হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। এই মন্তব্যের পটভূমিতে জাতীয় বেতন কমিশনের ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি প্রস্তাব এবং একই সঙ্গে ২০টি গ্রেড বজায় রাখার সিদ্ধান্ত রয়েছে।
টিআইবি উল্লেখ করেছে, বেতন-ভাতা বৃদ্ধির মাধ্যমে কর্মচারীদের পেশাগত উৎকর্ষ এবং জনগণের সেবার গুণগত মান নিশ্চিত করা সম্ভব, তবে তা বাস্তবায়নের আগে স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। সংস্থাটি জোর দিয়ে বলেছে, জনপ্রশাসনে প্রয়োজনীয় সংস্কার ছাড়া এই ধরনের আর্থিক প্রণোদনা দুর্নীতির ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।
জাতীয় বেতন কমিশন, যা সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খান নেতৃত্বে ২৩ সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত, সর্বনিম্ন বেতনকে ৮,২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০,০০০ টাকা করার এবং সর্বোচ্চ বেতনকে ৭৮,০০০ টাকা থেকে ১,৬০,০০০ টাকা করার সুপারিশ করেছে। একই সঙ্গে কমিশন পূর্বের মতোই ২০টি গ্রেড বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছে, যা বেতন কাঠামোর ধারাবাহিকতা রক্ষা করবে বলে ধারণা করা হয়।
প্রস্তাবিত বেতন বৃদ্ধি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সম্পদ সংগ্রহের পরিকল্পনা এখনো স্পষ্ট নয়। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান উল্লেখ করেছেন, আর্থিক সংকটে ভুগছে জনগণের ওপর এই অতিরিক্ত ব্যয় সরাসরি প্রভাব ফেলবে, তবে সরকার এখন পর্যন্ত কোনো তহবিল সংগ্রহের ব্যবস্থা বা সংশ্লিষ্ট নীতি প্রকাশ করেনি।
বেতন-ভাতা বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের জীবনের ব্যয় বাড়বে, এ বিষয়ে সরকার কীভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে তা স্পষ্ট না হওয়ায় টিআইবি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি দাবি করেছে, সরকার যদি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে, তবে তার আর্থিক সক্ষমতা, তহবিলের উৎস এবং ব্যয়ের সঠিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে।
টিআইবি আরও উল্লেখ করেছে, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিবেশে অতিরিক্ত ব্যয়ভার বহন করার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ ও নীতি গঠন করা হয়নি। তাই, বেতন বৃদ্ধি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে সরকারকে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং দুর্নীতি বিরোধী ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে।
সংস্থাটি সতর্ক করেছে, যদি এই শর্তগুলো পূরণ না হয়, তবে নতুন পে-স্কেল ঘুষ-দুর্নীতির প্রিমিয়াম বাড়ানোর একটি অব্যাহত প্রক্রিয়ায় পরিণত হতে পারে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, টিআইবি সরকারকে তৎক্ষণাৎ স্পষ্ট নীতি নির্ধারণ এবং জনসাধারণের আর্থিক বোঝা হ্রাসের জন্য পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানিয়েছে।
এ পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে টিআইবির উদ্বেগের কোনো আনুষ্ঠানিক উত্তর পাওয়া যায়নি। তবে, বেতন কমিশনের সুপারিশের পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্ট নীতি প্রণয়নের প্রক্রিয়া চলমান বলে জানা যায়।
এই বিতর্কের ফলে সরকারী কর্মচারীদের বেতন কাঠামো, জনসাধারণের আর্থিক চাপ এবং দুর্নীতি বিরোধী সংস্কারের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম সমন্বয় প্রয়োজনীয়তা উন্মোচিত হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন, বেতন বৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা সরকারী জনপ্রশাসনের স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হতে পারে।
অন্যদিকে, টিআইবির মতামতকে কেন্দ্র করে সরকারী নীতিনির্ধারকরা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, তা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জনসেবার গুণগত মানের উপর প্রভাব ফেলবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
টিআইবি শেষ পর্যন্ত জোর দিয়ে বলেছে, বেতন-ভাতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা যদি যথাযথ আর্থিক পরিকল্পনা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধক ব্যবস্থা ছাড়া বাস্তবায়িত হয়, তবে তা ঘুষ-দুর্নীতির নতুন স্তরে নিয়ে যেতে পারে। তাই, সরকারকে দ্রুত স্পষ্ট ব্যাখ্যা এবং কার্যকরী পদক্ষেপের মাধ্যমে এই ঝুঁকি কমাতে হবে।



