ঢাকার অনেক গৃহস্থালিতে রান্নার ঘর ছোট, সময়ের চাপ বেশি, আর গ্যাসের সিলিন্ডার কখনোই ঠিক সময়ে শেষ হয় না; এ সবের ফলে বড় রিনোভেশন না করে, কাউন্টারটপে বসানো একটিমাত্র যন্ত্রের দিকে মনোযোগ বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে ইন্ডাকশন ও ইনফ্রারেড স্টোভের চাহিদা বাড়ছে, যা গ্যাসের দামের অস্থিরতা মোকাবেলায় বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বছরের পর বছর গ্যাস সিলিন্ডার ঢাকার নগরী রান্নার মূল শক্তি হিসেবে কাজ করেছে; এটি কেরোসিনের তুলনায় পরিষ্কার, মাটির চুলার চেয়ে দ্রুত এবং অ্যাপার্টমেন্টে ব্যবহার করা সহজ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাসের দাম অনিয়মিতভাবে ওঠানামা করছে, ফলে গৃহস্থালির বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এই আর্থিক অস্থিরতা গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন জ্বালানি পদ্ধতি খোঁজার প্রেরণা দিচ্ছে।
বৈদ্যুতিক স্টোভের প্রধান সুবিধা হল তার পূর্বানুমানযোগ্যতা; বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের পর সরাসরি চালু করলে রান্না শুরু হয়, গ্যাসের সিলিন্ডার বুকিং বা জরুরি রিফিলের অপেক্ষা করতে হয় না। বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থিতিশীল থাকলে রান্নার সময়সূচি সহজে পরিকল্পনা করা যায়। ফলে গৃহস্থালির দৈনন্দিন রুটিনে কম ব্যাঘাত ঘটে।
ইন্ডাকশন স্টোভের কাজের পদ্ধতি কিছুটা ভবিষ্যতমুখী; এতে তাপ সরাসরি পাত্রের তলায় উৎপন্ন হয়, গ্যাস বা স্টোভের পৃষ্ঠে নয়। একটি চৌম্বকীয় ক্ষেত্র পাত্রের ধাতুতে শক্তি স্থানান্তর করে, ফলে পানির ফুটন্ত গতি দ্রুত হয় এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ তৎক্ষণাৎ পরিবর্তন হয়। এই প্রযুক্তি রান্নার গতি ও সঠিকতা বাড়ায়।
ইন্ডাকশন স্টোভের অন্যতম বড় সুবিধা হল তাপের ক্ষতি কম; পাত্রের ভিতরে তাপ উৎপন্ন হওয়ায় আশেপাশের বাতাস গরম হয় না, ফলে রান্নাঘর শীতল থাকে। তাছাড়া তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের সূক্ষ্মতা রান্নার ফলাফলকে ধারাবাহিক করে, বিশেষ করে প্রতিদিনের খাবার প্রস্তুতিতে সময় সাশ্রয় করে। এই নির্ভুলতা গৃহস্থালির জন্য বড় সুবিধা।
তবে ইন্ডাকশন স্টোভ ব্যবহার করতে পাত্রের তলায় চৌম্বকীয় বৈশিষ্ট্য থাকা প্রয়োজন; যদি পাত্রের তলে চুম্বক না লেগে থাকে, স্টোভ কাজ করবে না। বাংলাদেশের অনেক পরিবারে অ্যালুমিনিয়াম বা ঐতিহ্যবাহী পাত্র-পাতিলের ব্যবহার প্রচলিত, যা চৌম্বকীয় নয়, ফলে নতুন পাত্র কিনতে অতিরিক্ত খরচ হতে পারে। এই প্রয়োজনীয়তা কিছু গৃহস্থালির জন্য আর্থিক বাধা তৈরি করে।
ইন্ডাকশন স্টোভের শক্তি চাহিদা তুলনামূলকভাবে বেশি, যা পুরনো অ্যাপার্টমেন্টের বৈদ্যুতিক সিস্টেমে অতিরিক্ত লোড সৃষ্টি করতে পারে। পুরনো তারের ক্যাপাসিটি সীমিত হলে স্যুইচ বা ফিউজ বারবার ছাড়তে পারে, ফলে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ে। তাই স্টোভ ক্রয়ের আগে বিদ্যুৎ সংযোগের সক্ষমতা যাচাই করা জরুরি।
ইনফ্রারেড স্টোভের কাজের নীতি ভিন্ন; এতে পাত্রের তলায় ইনফ্রারেড রশ্মি নির্গত হয়, যা সরাসরি পাত্রকে গরম করে। গ্যাস বা ইন্ডাকশনের তুলনায় তাপের বিস্তার বেশি, ফলে রান্নাঘরের বাতাসও গরম হয়। এই ধরনের স্টোভ যেকোনো ধাতব পাত্রে ব্যবহার করা যায়, তাই বিদ্যমান পাত্র-পাতিলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ইনফ্রারেড স্টোভের সুবিধা হল প্রাথমিক খরচ তুলনামূলকভাবে কম এবং কোনো বিশেষ পাত্রের প্রয়োজন হয় না; তাই অ্যালুমিনিয়াম বা কাঁচের পাত্র ব্যবহারকারী গৃহস্থালির জন্য এটি সহজ বিকল্প। তবে তাপ নিয়ন্ত্রণ ইন্ডাকশনের মতো তীক্ষ্ণ নয়, ফলে সঠিক তাপমাত্রা বজায় রাখতে বেশি মনোযোগ দরকার। এছাড়া রান্নার সময় আশেপাশের তাপ বাড়ে, যা গরমের季তে অস্বস্তিকর হতে পারে।
বাজারে ইন্ডাকশন ও ইনফ্রারেড উভয় ধরনের স্টোভের প্রধান সরবরাহকারী হিসেবে ওয়ালটন, ভিশন, ফিলিপস এবং মিয়াকো উল্লেখযোগ্য। এই ব্র্যান্ডগুলো স্থানীয় বাজারে বিভিন্ন ক্ষমতা ও ডিজাইনের মডেল সরবরাহ করে, যা ভিন্ন ভিন্ন গৃহস্থালির চাহিদা পূরণে সক্ষম। তাদের পণ্যগুলো সাধারণত স্থানীয় ইলেকট্রিক্যাল শোরুমে সহজলভ্য।
গৃহস্থালি স্টোভ নির্বাচন করার সময় স্থান, বিদ্যুৎ ক্ষমতা, বিদ্যমান পাত্রের ধরন এবং বাজেটের বিষয়গুলো বিবেচনা করা দরকার। ছোট রান্নাঘরে একটিমাত্র কাউন্টারটপ যন্ত্রই যথেষ্ট, তবে বিদ্যুৎ সংযোগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইলেকট্রিশিয়ানের পরামর্শ নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে গ্যাসের দামের অস্থিরতা কমাতে কোন প্রযুক্তি বেশি উপযোগী তা মূল্যায়ন করা উচিত।
গ্যাসের দামের অস্থিরতা এবং নগরী জীবনের দ্রুত গতি বিবেচনা করলে ইন্ডাকশন ও ইনফ্রারেড স্টোভের গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে পারে। ভবিষ্যতে এই যন্ত্রগুলো গৃহস্থালির শক্তি ব্যবহারে পরিবর্তন আনতে পারে, বিশেষ করে যখন বৈদ্যুতিক গ্রিডের স্থিতিশীলতা উন্নত হবে। তাই বর্তমান সময়ে সঠিক প্রযুক্তি বেছে নেওয়া দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক ও পরিবেশগত সুবিধা এনে দেবে।



