কুতুবদিয়া—মগনামা নৌরুটে আধুনিক সি‑ট্রাক সেবার উদ্বোধন রবিবার বিকেলে পেকুয়ার মগনামা ঘাটে অনুষ্ঠিত হয়। নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম. সাখাওয়াত হোসেন উপস্থিত ছিলেন এবং নতুন সেবা চালু হওয়ার ঘোষণা দিলেন। এই উদ্যোগের মাধ্যমে দ্বীপের বাসিন্দা ও পর্যটকদের জন্য নিরাপদ ও দ্রুত সংযোগের পথ খুলে গেছে।
কুতুবদিয়া উপজেলা দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে যাতায়াত করে আসছিল। মগনামা ঘাটের সঙ্গে সংযোগের ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে সরকার আধুনিক নৌপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছিল। সি‑ট্রাকের প্রবেশে ঐতিহ্যবাহী ফেরি সেবার তুলনায় অধিক ক্ষমতা ও স্থায়িত্বের সুবিধা যুক্ত হয়েছে।
নতুন সি‑ট্রাকের গঠন দুই শত যাত্রী ধারণক্ষমতা সম্পন্ন, যা দৈনিক তিনটি সময়ে মগনামা ঘাট থেকে কুতুবদিয়ার দিকে এবং তদ্বিপরীত পথে চলবে। সকাল ৯টা, দুপুর ২টা ও সন্ধ্যা ৭টায় মগনামা ঘাট থেকে যাত্রা শুরু হবে, আর কুতুবদিয়া থেকে সকাল সাড়ে ৭টা, বেলা ১২টা ও বিকেল ৫টায় রওনা হবে। প্রতিটি যাত্রীর ভাড়া নির্ধারিত হয়েছে ত্রিশ টাকা, যা স্থানীয় জনগণের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে সেবা নিশ্চিত করে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নৌপরিবহন উপদেষ্টা সাখাওয়াত হোসেন সি‑ট্রাকের চালু হওয়াকে কুতুবদিয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থার নতুন দিগন্ত হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, দীর্ঘদিনের ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে যাতায়াতের সমস্যার সমাধান হিসেবে এই আধুনিক নৌযানটি নিরাপদ পরিবহন নিশ্চিত করবে। এছাড়া পর্যটন ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমে গতি আনতে এই সেবা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
উপদেষ্টা একই সঙ্গে ফেরিঘাট বিষয়ক রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সতর্কতা জানান। তিনি উল্লেখ করেন, ফেরি ঘাটের বিষয়কে রাজনৈতিক টানাপোড়েনে ব্যবহার করলে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয় এবং দ্বীপাঞ্চলের অগ্রগতি ব্যাহত হয়। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি সকল রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে একতাবদ্ধ হয়ে বাস্তবিক সমস্যার সমাধানে মনোযোগ দিতে আহ্বান জানান।
স্থানীয় বাসিন্দারা সি‑ট্রাকের চালু হওয়ায় বড় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। তারা দীর্ঘদিনের ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রার পর এখন নিরাপদ ও দ্রুত যাতায়াতের সম্ভাবনা পেয়ে আনন্দিত। তবে অনেকেই দীর্ঘমেয়াদে ফেরি সেবার পুনরায় চালু হওয়ার দাবিও তুলে ধরেছেন, যাতে সব ধরনের যাত্রীদের জন্য বিকল্প থাকে।
বর্ষা মৌসুমে উত্তাল সাগরের কারণে কুতুবদিয়া ও মূল ভূখণ্ডের সংযোগ প্রায়ই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ঐ সময়ে সি‑ট্রাকের নিয়মিত চলাচল দ্বীপের জরুরি সরবরাহ ও চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসনও এই সেবা ব্যবহার করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার পরিকল্পনা করেছে।
নতুন সি‑ট্রাকের সূচি ও ভাড়া সম্পর্কে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) বিস্তারিত জানিয়েছে। প্রতিদিন তিনটি রাউন্ড ট্রিপের মাধ্যমে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন হবে, যা স্থানীয় ব্যবসা ও কৃষি পণ্যের বাজারে প্রবেশ সহজ করবে। ত্রিশ টাকার ভাড়া নির্ধারণের মাধ্যমে সেবা সবার জন্য সুলভ রাখা হয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান মো. সলিম উল্লাহ, ঢাকা বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক জয়নাল আবেদীনসহ উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তাদের উপস্থিতি নতুন নৌপরিবহন প্রকল্পের গুরুত্ব ও সরকারের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেছে। সকল অংশগ্রহণকারী সি‑ট্রাকের কার্যকরী পরিচালনা ও ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন।
এই সেবা চালু হওয়ার ফলে কুতুবদিয়া ও মগনামা ঘাটের মধ্যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক মিথস্ক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, পর্যটক সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে এবং দ্বীপের হস্তশিল্প ও সামুদ্রিক খাবারের চাহিদা বাড়বে। একই সঙ্গে সরকারকে আরও অবকাঠামো উন্নয়নে মনোযোগ দিতে হবে, যাতে দীর্ঘমেয়াদে দ্বীপের সমগ্র উন্নয়ন নিশ্চিত হয়।
সর্বশেষে, নৌপরিবহন উপদেষ্টা সাখাওয়াত হোসেনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বিরোধী মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সকল রাজনৈতিক দলকে একত্রে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কুতুবদিয়া ও অন্যান্য দ্বীপাঞ্চলের উন্নয়ন কেবল সমন্বিত প্রচেষ্টায়ই সম্ভব। ভবিষ্যতে সি‑ট্রাকের পাশাপাশি ফেরি সেবার পুনরায় চালু হওয়াও দ্বীপের সংযোগের বহুমুখী বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হবে।



