সিরিয়ার সরকারী সেনাবাহিনী ও কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (এসডিএফ) ২৩ জানুয়ারি রাতের দিকে চার দিনের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ১৫ দিনের অতিরিক্ত বিরতি অনুমোদন করেছে। এই সিদ্ধান্তের লক্ষ্য বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং অঞ্চলীয় স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।
সিরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় গভীর রাতে একটি বিবৃতি প্রকাশ করে জানায়, স্থানীয় সময় রাত ১১ টা থেকে কার্যকর হওয়া এই বর্ধিত বিরতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি অভিযানের সহায়তা হিসেবে কাজ করবে। অভিযানের অংশ হিসেবে এসডিএফের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিভিন্ন আটক কেন্দ্র থেকে আইএসআইএল (আইএস) বন্দিদের স্থানান্তর পরিকল্পনা রয়েছে।
এসডিএফের পক্ষও একই সময়ে একটি প্রকাশনা দিয়ে নিশ্চিত করেছে যে, এই চুক্তি উত্তেজনা হ্রাস, বেসামরিক সুরক্ষা এবং দেশের পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করবে। তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদী শান্তি অর্জনের জন্য এই ধাপটি অপরিহার্য।
বিরতির ঘোষণার পর সিরিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে স্বস্তির বাতাবরণ দেখা যায়। মাসের শুরুর দিকে পুনরায় শুরু হওয়া সংঘর্ষের পর থেকে দেশটি উদ্বেগের মধ্যে ছিল, বিশেষ করে এসডিএফকে জাতীয় সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করার প্রশ্নটি কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
সংঘর্ষের মূল সূত্রপাত হয় এসডিএফের একীভূতকরণ নিয়ে মতবিরোধ থেকে, যা দু’পক্ষের মধ্যে সামরিক মুখোমুখি হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই বিরোধের ফলে উত্তরে এবং পূর্বে বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়, যার মধ্যে তেলক্ষেত্র, জলবিদ্যুৎ বাঁধ এবং আইএস বন্দিদের আটকস্থল অন্তর্ভুক্ত।
সিরিয়ার সেনাবাহিনী সাম্প্রতিক সপ্তাহে আলেপ্পো শহর থেকে আক্রমণ চালিয়ে এসডিএফের প্রধান ঘাঁটি হটিয়ে দেয় এবং রাক্কা প্রদেশের আল-আকতান কারাগারসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো দখল করে। এই জয়গুলো সরকারকে কৌশলগতভাবে শক্তিশালী করে এবং আইএস যোদ্ধা ও তাদের পরিবারকে আটক রাখা সুবিধা দেয়।
যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পূর্বে, সিরিয়ার সেনাবাহিনী শেষ শক্ত ঘাঁটির দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। এই মুহূর্তে প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা হঠাৎ করে বিরতির আহ্বান জানিয়ে এসডিএফকে শনিবার রাত পর্যন্ত সময় দেন, যাতে তারা অস্ত্র ত্যাগ করে জাতীয় সেনাবাহিনীতে একীভূত হওয়ার পরিকল্পনা উপস্থাপন করে, না হলে পুনরায় সংঘর্ষের সম্ভাবনা থাকবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই প্রক্রিয়ায় সক্রিয় কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। দীর্ঘদিনের মিত্র হিসেবে এসডিএফের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নতুন সিরিয়ার নেতৃত্বের সঙ্গে সমন্বয় করে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি এবং এসডিএফের সামরিক ও বেসামরিক কাঠামোকে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগে কাজ করছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, এই বর্ধিত বিরতি মানবিক সহায়তার প্রবাহ সহজ করবে এবং তেল ও জ্বালানি ক্ষেত্রের পুনরুদ্ধারকে ত্বরান্বিত করবে, তবে রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদী শান্তি অর্জন কঠিন। তারা যুক্তি দেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এবং সিরিয়ার নতুন সরকারী কাঠামোই মূল চালিকাশক্তি হবে।
পূর্বে ৯ জানুয়ারি ঘোষিত চার দিনের যুদ্ধবিরতি তুলনায় এই ১৫ দিনের বর্ধিত বিরতি বেশি সময়ের জন্য সংঘর্ষের থামা নিশ্চিত করে। তবে উভয় পক্ষের মধ্যে এখনও সমঝোতার ঘাটতি রয়েছে, বিশেষ করে এসডিএফের ভবিষ্যৎ অবস্থান এবং জাতীয় সেনাবাহিনীতে একীভূতকরণ সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে।
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলি বন্দি স্থানান্তরের অগ্রগতি এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে। এছাড়া, সিরিয়ার সরকার ও এসডিএফের মধ্যে অতিরিক্ত আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত দেশের রাজনৈতিক পুনর্গঠন ও স্থিতিশীলতা নির্ধারণ করবে।
সারসংক্ষেপে, ১৫ দিনের যুদ্ধবিরতি সাময়িক স্বস্তি এনে দিয়েছে, তবে দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ইচ্ছা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সমর্থন দুটোই অপরিহার্য। এই সময়কালে অঞ্চলীয় নিরাপত্তা, মানবিক সহায়তা এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।



