সিডনি হারবারে ১৮ জানুয়ারি একটি হাঙরের আক্রমণে ১২ বছর বয়সী নিকো অ্যান্টিকের প্রাণ শেষ হয়। নিকো তার বন্ধুদের সঙ্গে সমুদ্রের ঢেউতে লাফ দিচ্ছিলেন, তখনই একটি বুল হাঙর তার পায়ে কামড়ায়। আহত কিশোরকে তৎক্ষণাৎ সিডনি শিশু হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হয়, তবে অস্ত্রোপচারের পরেও তার জীবন রক্ষা করা যায়নি।
নিরাপত্তা সংক্রান্ত কর্তৃপক্ষের মতে, হাঙরের আক্রমণটি হঠাৎ ঘটেছে এবং হুমকির কারণ হিসেবে উষ্ণ ও লবণাক্ততা কমে যাওয়া পানিকে উল্লেখ করা হয়েছে। নিকোর মা-দাদা, লরেনা ও জুয়ান, প্রকাশ্যে শোক প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের সন্তান নিকোর মৃত্যুতে আমরা গভীর শোকাহত” এবং তাকে স্মরণে রাখার জন্য পরিবারিক গুণাবলী বর্ণনা করেন।
নিকোর পরিবার আর্জেন্টিনার বাসিন্দা, এবং নিকোকে বর্ণনা করা হয় হাসিখুশি, বন্ধুবৎসল ও দয়ালু হিসেবে। হামলার পর নিকোর বন্ধুদের তৎক্ষণাৎ পানিতে ঝাঁপিয়ে তার জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করা হয়, যা স্থানীয়দের প্রশংসা পায়। তবে নিকোর পায়ে গুরুতর চোট লেগে যায়, ফলে তার শ্বাস-প্রশ্বাসে ব্যাঘাত ঘটে।
চিকিৎসা সংস্থার মতে, নিকোকে জরুরি শল্যচিকিৎসা করা হয় এবং তার পা স্থিতিশীল করার জন্য কোমায় স্থাপন করা হয়। শল্যচিকিৎসার পরেও রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণে না আসায় তার অবস্থা দ্রুত খারাপ হয় এবং শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যু ঘটে। রোগীর পরিবারকে সমর্থন করার জন্য অনলাইন তহবিল সংগ্রহ করা হয়, যেখানে প্রায় দুই লক্ষ চল্লিশ হাজার ডলার (প্রায় এক লক্ষ একুশ হাজার পাউন্ড) সংগ্রহ করা হয়েছে।
নিকোর মৃত্যুর পর সিডনি ও নিউ সাউথ ওয়েলস উপকূলে হাঙরের আক্রমণ বাড়ার প্রবণতা দেখা যায়। একই সপ্তাহে, সিডনির নর্দান বিচেসে এক তরুণ সার্ফার হাঙরের কামড় থেকে বেঁচে যান, যদিও তিনি ক্ষতিগ্রস্ত হন। কয়েক ঘণ্টা পরে আরেকটি সৈকতে ২৭ বছর বয়সী এক ব্যক্তি একই রকম আক্রমণে গুরুতর আঘাত পেয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন।
এরপরের দিন, নিউ সাউথ ওয়েলসের মধ্য-উত্তর উপকূলে ৩৯ বছর বয়সী এক ব্যক্তি হাঙরের কামড়ে আহত হয়ে পানির কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়। তার বুকে আঘাত লেগে থাকে এবং তাকে তৎক্ষণাৎ চিকিৎসা কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। এই তিনটি ঘটনা একসাথে দুই দিনের মধ্যে ঘটায়, যা স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করেছে।
অস্ট্রেলিয়ার রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল ইনফরমেশন টেকনোলজি (RMIT) এর সিনিয়র রিসার্চ ফেলো রেবেকা অলিভ উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে মিষ্টি পানির প্রবাহ বাড়ে, যা বুল হাঙরের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে। তিনি বলেন, বুল হাঙর গরম ও লবণাক্ততা কমে যাওয়া পানিতে বেশি সক্রিয় থাকে, ফলে নদীর মুখ ও লিম্পে তাদের উপস্থিতি বাড়ে।
সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ক্রিস পেপিন-নেফও একই বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, মিষ্টি পানির প্রবাহে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য দ্রুত বৃদ্ধি পায়, যা শিকারি মাছের সংখ্যা বাড়ায় এবং হাঙরের শিকারি হিসেবে তাদের আকর্ষণ বাড়ায়। এই পরিবেশগত পরিবর্তন হাঙরের আক্রমণ বাড়ার পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পুলিশ ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে এবং হাঙরের উপস্থিতি ও আচরণ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য সমুদ্র পর্যবেক্ষণ দলকে সক্রিয় করেছে। এছাড়া, স্থানীয় সাঁতারু ও পর্যটন সংস্থাগুলিকে সতর্কতা অবলম্বন করতে এবং নিরাপদ সাঁতারু অঞ্চল নির্ধারণে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
অধিকন্তু, নিউ সাউথ ওয়েলসের পরিবেশ মন্ত্রণালয় হাঙরের আক্রমণ নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। এতে সমুদ্র তীরবর্তী এলাকায় সতর্কতা সিস্টেম স্থাপন, হাঙর পর্যবেক্ষণ ড্রোন চালু এবং জনসাধারণকে সতর্কতা জানাতে তথ্য প্রচার অন্তর্ভুক্ত।
এই ঘটনার পর, স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে শোকের পাশাপাশি হাঙরের আক্রমণ প্রতিরোধে সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। নিকোর পরিবার ও বন্ধুদের সমর্থনে গৃহীত তহবিল সংগ্রহের মাধ্যমে ভবিষ্যতে অনুরূপ দুর্ঘটনা রোধে সচেতনতামূলক কাজ চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি প্রকাশ করা হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, সিডনি ও তার পার্শ্ববর্তী উপকূলে হাঙরের আক্রমণ বাড়ার প্রবণতা পরিবেশগত পরিবর্তন ও মানব কার্যকলাপের সমন্বয়ে ঘটছে। কর্তৃপক্ষের তদন্ত চলমান থাকায়, ভবিষ্যতে হাঙরের আচরণ নিয়ন্ত্রণে কী ধরনের নীতি গৃহীত হবে তা সময়ের সাথে স্পষ্ট হবে।



