রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের মোট ব্যয় ২৫,৫৯২ কোটি টাকা বৃদ্ধি করার প্রস্তাব জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) অনুমোদন করেছে। একনেকের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে রবিবার এনইসি সম্মেলন কক্ষে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় জানায়, এই অতিরিক্ত ব্যয় সম্পূর্ণভাবে প্রকল্প ঋণ থেকে পূরণ হবে। ফলে প্রকল্পের মোট ব্যয় ১,১৩,০৯২ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১,৩৮,৬৮৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
রূপপুরে রাশিয়ার সহায়তায় বাংলাদেশ সরকার প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তুলছে, যেখানে দুইটি ইউনিট প্রত্যেকটি ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতায় কাজ করবে, মোট উৎপাদন ক্ষমতা ২৪০০ মেগাওয়াট। সরকার প্রাথমিকভাবে প্রকল্পের ১০ শতাংশ অর্থায়ন করবে, বাকি ৯০ শতাংশ রাশিয়া ঋণ হিসেবে দেবে।
একনেকের সভায় সরকারী অর্থায়নের পরিমাণ ১৬৬ কোটি টাকা কমিয়ে ২১,৮৮৬ কোটি টাকা নির্ধারিত হয়েছে; পূর্বে এটি ২২,০৫২ কোটি টাকা ছিল। যদিও সরকারী অংশ কমেছে, তবু তা ঋণ থেকে সরবরাহ করা হবে।
ঋণ পরিমাণের হিসাবেও পরিবর্তন এসেছে; এখন প্রকল্প ঋণ ১,১৬,৭৯৯ কোটি টাকা, যা পূর্বের ৯১,০৪০ কোটি টাকার তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। ঋণ বৃদ্ধির ফলে ভবিষ্যতে ঋণসেবা খরচ এবং আর্থিক দায়বদ্ধতা বাড়বে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের কার্যকাল ৬০ বছর নির্ধারিত, এবং প্রয়োজন অনুসারে অতিরিক্ত ২০ বছর পর্যন্ত বৃদ্ধি করা যাবে। দীর্ঘমেয়াদী বিদ্যুৎ সরবরাহের নিশ্চয়তা থাকলেও, ঋণ পরিশোধের পরিকল্পনা ও সুদের বোঝা আর্থিক বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রকল্পের ভিত্তি শিলাপাথর স্থাপন ২০১৩ সালের অক্টোবর মাসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্পন্ন করেন। ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে প্রথম ইউনিটের চুল্লি ও শীতলকারী ডোমের কংক্রিট ঢালাই কাজের উদ্বোধন করা হয়।
একনেকের সর্বশেষ সভায় মোট ২৫টি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে, যার মধ্যে নতুন ১৪টি, সংশোধিত ৬টি এবং মেয়াদ বৃদ্ধি ৫টি। এই সব প্রকল্পের সম্মিলিত ব্যয় ৪৫,১৯১ কোটি টাকা, যার অর্ধেকের বেশি রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পে বরাদ্দ।
অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে রোড ও সেতু মন্ত্রণালয়ের ‘রাঙমাটি (মানিকছড়ি)-মহালছড়ি-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়ক (R‑162) প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন’ অন্তর্ভুক্ত। এই রোডটি দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের পরিবহন সংযোগ শক্তিশালী করবে।
একই মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘মুন্সীগঞ্জ সড়ক বিভাগে ৩টি আঞ্চলিক মহাসড়ক ও ১টি জেলা মহাসড়ককে যথাযথ মানে উন্নীতকরণ’ প্রকল্পও অনুমোদিত হয়েছে, যা স্থানীয় বাণিজ্যিক কার্যক্রমে সহায়ক হবে।
গৃহায়ন ও নগর উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের ‘চট্টগ্রাম লালখান বাজার থেকে শাহ‑আমানত বিমানবন্দর পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে’ প্রকল্পও তালিকায় রয়েছে, যা শহরের ট্রাফিক জ্যাম কমাতে লক্ষ্য রাখে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, রূপপুরের ব্যয়বৃদ্ধি সরাসরি বিদ্যুৎ সেক্টরের আর্থিক কাঠামোকে প্রভাবিত করবে। ঋণ পরিমাণের বৃদ্ধি বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি মূল্যায়নে পরিবর্তন আনতে পারে, আর বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিক থেকে দীর্ঘমেয়াদে সরবরাহের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হবে।
সংক্ষেপে, রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি এবং ঋণ পরিমাণের পরিবর্তন বাংলাদেশ সরকারের শক্তি অবকাঠামো উন্নয়নের আর্থিক দিককে পুনরায় সাজাচ্ছে। ভবিষ্যতে ঋণ সেবা ও সুদের বোঝা পরিচালনা করা, পাশাপাশি বিদ্যুৎ বাজারে সরবরাহের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা মূল চ্যালেঞ্জ হবে।



