জাতীয় নির্বাচনের দিন ১২ ফেব্রুয়ারি নিকটবর্তী হওয়ায় বাংলাদেশে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা সম্পর্কে ইউনেসকো গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে। প্যারিসভিত্তিক এই আন্তর্জাতিক সংস্থা, শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে, দেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমে সাম্প্রতিক হামলার পরিপ্রেক্ষিতে সতর্কতা প্রকাশ করেছে। ইউনেসকোর মতবিনিময় ও নিরাপত্তা প্রকল্পের প্রধান মেহেদি বেনচেলাহ, শনিবার সন্ধ্যায় প্রথম আলো কার্যালয় পরিদর্শন করে পরিস্থিতি সরেজমিনে জানার চেষ্টা করেন।
মেহেদি বেনচেলাহের নেতৃত্বে ইউনেসকোর প্রতিনিধিদল প্রথম আলোয়ের নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফের স্বাগত গ্রহণের পর সরাসরি রাজধানীর কারওয়ান বাজারে অবস্থিত প্রথম আলোয়ের পুড়ে যাওয়া ও লুট হওয়া ভবন পরিদর্শন করেন। ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা দেখেই তিনি বিস্মিত হন এবং সংস্থার গণমাধ্যমের পাশে থাকার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। ইউনেসকো, বিশেষ করে নির্বাচনকালীন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়, সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার জন্য সহযোগিতা বাড়াবে বলে জানায়।
পরিদর্শনের সময় মেহেদি বেনচেলাহকে প্রথম আলোয়ের নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ এবং কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের সঙ্গে বৈঠকের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। বৈঠকে তিনি সাম্প্রতিক হামলার সম্ভাব্য উদ্দেশ্য এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে বিশদ জানতে চান। সাজ্জাদ শরিফ ১৮ ডিসেম্বর রাতের হামলার ঘটনাটি বিশদভাবে উপস্থাপন করেন, যেখানে প্রথম আলোয়ের ২৭ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি আক্রমণ ঘটেছিল।
হামলার ফলে ভবনটি ব্যাপকভাবে পুড়ে গিয়ে, প্রিন্ট ও অনলাইন উভয় সংস্করণ এক দিনের জন্য বন্ধ করতে বাধ্য হয়। তবে পরের দিন থেকেই প্রকাশনা স্বাভাবিকভাবে চালু হয়। এই ঘটনার পর সাংবাদিকদের মানসিক আঘাতের কথাও উল্লেখ করা হয়, যেখানে বহু কর্মী নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়ার কঠিনতা বর্ণনা করেন।
বৈঠকে ইউনেসকোর প্রতিনিধি জিজ্ঞাসা করেন, ভবিষ্যতে আবার এমন কোনো হামলার ঝুঁকি আছে কিনা এবং সাংবাদিকরা কতটা নিরাপদ বোধ করছেন। সাজ্জাদ শরিফ জানান, যদিও কিছু ঝুঁকি রয়ে গেছে, তবু নাগরিক সমাজ ও বিভিন্ন স্তরের মানুষের তীব্র প্রতিক্রিয়া এবং সমর্থন নিরাপত্তা পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, সংস্থার কর্মীরা এখনো নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নে সচেতন এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা গ্রহণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
মেহেদি বেনচেলাহ ইউনেসকোর দৃষ্টিকোণ থেকে উল্লেখ করেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার বজায় রাখার জন্য অপরিহার্য। তিনি বলেন, সংস্থা নির্বাচনের সময় সাংবাদিকদের সম্মুখীন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রশিক্ষণ, সুরক্ষা সরঞ্জাম এবং জরুরি সহায়তা প্রদান করবে। এছাড়া, স্থানীয় নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় বাড়িয়ে সম্ভাব্য হুমকি দ্রুত সনাক্ত ও প্রতিক্রিয়া জানাতে কাজ করবে।
ইউনেসকোর এই উদ্যোগের পটভূমিতে সাম্প্রতিক মাসে দেশের প্রধান সংবাদমাধ্যমে একাধিক হামলা ঘটেছে, যা সাংবাদিকদের কাজের পরিবেশকে অস্থির করে তুলেছে। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সংস্থার হস্তক্ষেপের মাধ্যমে নিরাপত্তা মানদণ্ড উন্নয়ন এবং জরুরি প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য স্পষ্ট।
সাজ্জাদ শরিফের মতে, প্রথম আলোয়ের কর্মীরা এখনো নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ইউনেসকোর সহায়তা প্রত্যাশা করছেন। তিনি উল্লেখ করেন, সংস্থার সমর্থন পাবার মাধ্যমে ভবিষ্যতে নির্বাচনী কভারেজে কোনো বাধা না রেখে স্বাধীনভাবে রিপোর্টিং চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।
ইউনেসকোর প্রতিনিধিরা উল্লেখ করেন, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে শুধুমাত্র শারীরিক সুরক্ষা নয়, মানসিক সহায়তা ও পুনর্বাসনকেও গুরুত্ব দিতে হবে। তাই, সাংবাদিকদের জন্য পরামর্শমূলক সেশন, মানসিক স্বাস্থ্য সেবা এবং জরুরি যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
জাতীয় নির্বাচনের আগে এই ধরনের আন্তর্জাতিক মনোযোগ ও সহায়তা, দেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ইউনেসকোর উদ্বেগ ও সহায়তা, নির্বাচনকালীন তথ্যের স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বজায় রাখতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অবশেষে, ইউনেসকো এবং প্রথম আলো উভয়ই নিরাপদ ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য সমন্বিত কাজের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। নির্বাচনের দিন নাগাদ সকল মিডিয়া কর্মী নিরাপদে কাজ করতে পারলে, দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জনগণের তথ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত হবে।



