ঢাকায় বসন্তের তাপের বদলে ধোঁয়াটে কুয়াশা ছড়িয়ে পড়েছে, এবং এই পরিস্থিতিতে বাইরে ব্যায়াম করা স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক বায়ু মান পর্যবেক্ষণ সংস্থা IQAir অনুযায়ী, জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এ ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর শীর্ষে ছিল, AQI স্কোর ৩১৬ রেকর্ড করেছে।
অনেকের জন্য তাজা সকালের বাতাসে হাঁটা বা দৌড়ানো, এবং খোলা মাঠে খেলাধুলা করা স্বাস্থ্যের মূল চাবিকাঠি বলে ধরা হয়। বিশেষ করে শিশুরা ও কিশোর-কিশোরীরা শারীরিক ফিটনেসের পাশাপাশি মানসিক ও আবেগীয় বিকাশের জন্য বাইরে সময় কাটাতে উৎসাহিত হয়।
কিন্তু ঢাকা শহরের বায়ু দূষণ মাত্র কয়েক বছর আগে থেকে দ্রুত বাড়ছে, ফলে স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসের কাজেও বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। গড়ে প্রতি দিনই শহরটি এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (AQI) শীর্ষ দশের তালিকায় স্থান পায়, এবং এই বছর সকালে ৩১৬ পয়েন্টে শীর্ষে উঠে এসেছে।
AQI স্কোরের মানদণ্ড অনুযায়ী ০–৫০ ‘ভাল’, ৫১–১০০ ‘মাঝারি’, ১০১–১৫০ ‘সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর’, ১৫১–২০০ ‘অস্বাস্থ্যকর’, ২০১–৩০০ ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ এবং ৩০১ উপরে ‘বিপজ্জনক’ হিসেবে চিহ্নিত হয়। ঢাকা বর্তমানে ৩১৬ পয়েন্টে ‘বিপজ্জনক’ সীমার মধ্যে পড়ে, যা শ্বাসযন্ত্রের রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
বিশ্বব্যাপী বায়ু মানের র্যাঙ্কিংয়ে ঢাকা ধারাবাহিকভাবে শীর্ষ দশে রয়েছে। বিশেষ করে শীতকালীন মাসগুলোতে, যখন আর্দ্রতা কমে যায়, ধূলিকণা মাটির কাছাকাছি জমে থাকে এবং শ্বাসপ্রশ্বাসের পথে সহজে প্রবেশ করে। এই সময়ে শহরের বায়ু গুণমান বিশেষভাবে হ্রাস পায়।
বৈশ্বিক বায়ু মান প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১,৭৩,০০০ মানুষ বায়ু দূষণের কারণে মৃত্যুবরণ করে। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউটের এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্স দেখায়, বায়ু দূষণ দেশের গড় আয়ু প্রায় সাত বছর কমিয়ে দেয়। এই পরিসংখ্যান ঢাকার বাসিন্দাদের জন্য বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।
শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা এই ঝুঁকির সবচেয়ে বেশি শিকার। তাদের ফুসফুস ও প্রতিরোধ ক্ষমতা এখনও বিকাশের পর্যায়ে থাকায়, দূষিত বায়ু শ্বাস নেওয়া শ্বাসযন্ত্রের রোগ, অ্যালার্জি এবং দীর্ঘমেয়াদী শ্বাসকষ্টের কারণ হতে পারে। তাই বাইরে খেলাধুলা করা তাদের স্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়ায়।
নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আর্দ্রতা কম থাকে, ফলে ধূলিকণা মাটির কাছাকাছি ঘনত্বে থাকে এবং বাতাসের সঙ্গে সহজে মিশে যায়। এই মৌসুমে ঢাকা শহরের তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে উচ্চ, যা ধূলিকণার উড্ডয়নকে ত্বরান্বিত করে এবং বায়ু দূষণকে আরও তীব্র করে।
নিয়মিত ব্যায়াম করা মানুষদের জন্যও এই পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জিং। যদিও শারীরিক কার্যকলাপ হৃদয়-রক্তবাহিক সিস্টেমের জন্য উপকারী, তবে দূষিত বায়ু শ্বাস নেওয়া ফুসফুসের ক্ষতি বাড়াতে পারে এবং ব্যায়ামের সুবিধা হ্রাস করতে পারে। তাই বাইরে ব্যায়াম করার সময় বায়ু মানের পর্যবেক্ষণ জরুরি।
বায়ু দূষণকে মাথায় রেখে, বিশেষজ্ঞরা ঘরের ভিতরে জিম বা হোম ওয়ার্কআউটের ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দেন। যদি বাইরে ব্যায়াম করা অপরিহার্য হয়, তবে AQI মান ১০০ এর নিচে থাকলে এবং সঠিক ফিল্টারযুক্ত মাস্ক পরিধান করে শ্বাসনালীকে রক্ষা করা উচিত। রিয়েল-টাইম বায়ু মান অ্যাপ ব্যবহার করা সহায়ক।
দীর্ঘমেয়াদে বায়ু মানের উন্নতি না হলে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে থাকবে, তাই সরকার ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের জন্য জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান রয়েছে। শিল্প নিঃসরণ কমানো, যানবাহনের ধোঁয়া হ্রাস এবং সবুজায়ন প্রকল্প ত্বরান্বিত করা হলে বায়ু মানের পরিবর্তন সম্ভব।
বাহিরে হাঁটা-দৌড়ের স্বাভাবিক অভ্যাসকে পুনর্বিবেচনা করা এখন সময়ের দাবি। পাঠকগণ কীভাবে নিজের ও পরিবারের স্বাস্থ্যের রক্ষা করবেন, তা নিয়ে চিন্তা করা জরুরি। আপনার মতামত ও অভিজ্ঞতা শেয়ার করুন, যাতে একসাথে নিরাপদ ব্যায়ামের পথ খুঁজে পাওয়া যায়।



