ঢাকার কর্পোরেট অফিসে নতুন স্নাতকরা যখন প্রথম পদক্ষেপ নেয়, তখন তারা একটি বাস্তবতা সম্মুখীন হয় যা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে শেখানো মানবসম্পদ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানবসম্পদকে সর্বোচ্চ সম্পদ হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও, বাস্তবে কর্মচারীদেরকে প্রায়শই দায়িত্বের বদলে বোঝা হিসেবে দেখা হয়। এই বৈপরীত্যের মূল কারণ হল দেশের গ্র্যাজুয়েটের অতিরিক্ত সরবরাহ, যা নিয়োগকারীদেরকে মজুরি নিয়ে আলোচনা করার সময় উল্লেখযোগ্য সুবিধা দেয়।
স্নাতক সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে প্রতিটি চাকরির জন্য প্রার্থীর সংখ্যা বিশাল, ফলে কোম্পানিগুলো জানে যে একজন কর্মী ন্যায্য বেতনের দাবি করলে অন্য ৫০ জন প্রার্থী কম বেতনে কাজ করতে ইচ্ছুক। এই পরিস্থিতি বেতন কাঠামোকে এমন স্তরে নামিয়ে দেয় যেখানে কর্মীর কাজের মূল্যায়ন যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না, ফলে কর্মস্থলে অবমাননাকর আচরণ ও মানবিকতা হ্রাস পায়।
কর্মচারীর মনোবল হ্রাস পেলে উৎপাদনশীলতা কমে যায়, যা শেষ পর্যন্ত কোম্পানির লাভের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। যখন কর্মী নিজেকে অপ্রয়োজনীয় বা বোঝা হিসেবে অনুভব করে, তখন তার কাজের গুণগত মান ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা হ্রাস পায়। ফলে, দেশের তরুণ মেধা যা শিল্পখাতকে রূপান্তরিত করার সম্ভাবনা রাখে, তা যথাযথ পারিশ্রমিক না পেয়ে সম্পূর্ণভাবে ব্যবহারযোগ্য হয় না।
এই সমস্যার আর্থিক প্রভাব শুধুমাত্র কোম্পানির ব্যালান্স শিটে প্রকাশ পায় না; এটি প্রতিটি পরিবারের জীবনের মানে প্রভাব ফেলে। “অফিসার” শিরোনামধারী কর্মীদের সামাজিক প্রত্যাশা অনুযায়ী স্যুট পরা, নির্দিষ্ট জীবনধারা বজায় রাখা এবং উচ্চমানের খরচ মেটাতে হয়, কিন্তু মজুরি বৃদ্ধির হার মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে না চলায় অনেকেই আর্থিক চাপে পড়ে। ফলে, কর্মচারীরা অতিরিক্ত কাজের সময়, পার্ট-টাইম চাকরি বা ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহে বাধ্য হয়।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, এই ধরনের বেতন নীতি দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদে বিনিয়োগের ঘাটতি তৈরি করে, যা দেশের প্রতিযোগিতামূলকতা হ্রাসের ঝুঁকি বাড়ায়। বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং বহুজাতিক কোম্পানিগুলো যখন স্থানীয় অংশীদারিত্বের সন্ধান করে, তখন তারা কর্মশক্তির দক্ষতা ও প্রেরণার ওপর নির্ভরশীল। যদি এই ভিত্তি দুর্বল থাকে, তবে বিনিয়োগের আকর্ষণ কমে যায় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে যায়।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে, ন্যায্য বেতন নীতি না মেনে চলা কোম্পানিগুলো ভবিষ্যতে কর্মী পরিবর্তনের উচ্চ খরচ, প্রশিক্ষণ ব্যয় এবং উৎপাদনশীলতার হ্রাসের সম্মুখীন হবে। এছাড়া, কর্মচারীর অসন্তোষ সামাজিক অশান্তি ও শ্রমিক আন্দোলনের ঝুঁকি বাড়াতে পারে, যা ব্যবসায়িক পরিবেশকে অস্থিতিশীল করে তুলবে।
এই প্রেক্ষাপটে, সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলোকে যৌথভাবে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ, বেতন স্বচ্ছতা এবং কর্মচারীর অধিকার রক্ষার জন্য নীতি প্রণয়নে ত্বরান্বিত হওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বাস্তবমুখী মানবসম্পদ প্রশিক্ষণ ও কর্মস্থল বাস্তবতা সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে তারা কর্মজীবনে সঠিক প্রত্যাশা গড়ে তুলতে পারে।
সংক্ষেপে, বাংলাদেশের কর্পোরেট সংস্কৃতিতে ন্যায্য বেতনকে কেবল কর্পোরেট “সৌজন্য” হিসেবে নয়, বরং ব্যবসায়িক কৌশলগত প্রয়োজন হিসেবে গ্রহণ করা জরুরি। এটি কর্মশক্তির প্রেরণা বাড়াবে, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করবে এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক অবদান রাখবে। ভবিষ্যতে যদি এই সমস্যার সমাধান না করা হয়, তবে মানবসম্পদের অপচয় এবং বাজারের অস্থিতিশীলতা বাড়তে থাকবে, যা শেষ পর্যন্ত দেশের সামগ্রিক প্রতিযোগিতার ওপর প্রভাব ফেলবে।



