ইরানের তরুণ শিল্পীরা গোপনভাবে পরিচালিত একটি নাট্যচিত্র, ‘দ্য ফ্রেন্ডস হাউস ইজ হিয়ার’, স্যান্ডেন্স চলচ্চিত্র উৎসবে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রামাটিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছে। হোসেইন কেশাভার্জ ও মারিয়াম আতায়ি যৌথভাবে পরিচালনা করা এই কাজটি, দেশের সাম্প্রতিক প্রতিবাদ ও দমনমূলক নীতির প্রেক্ষাপটে গোপনভাবে শুট করা হয়েছিল এবং সীমান্ত পার হয়ে উৎসবে পৌঁছায়।
টেলাভিভিলের গরম গ্রীষ্মের সন্ধ্যায়, তেহরানের রাস্তায় একটি সঙ্গীত পারফরম্যান্সের চারপাশে জমা হওয়া ভিড়ের মধ্যে, হানা মানা ও ফারজাদ কারেন অভিনীত তরুণ দম্পতি একে অপরের সঙ্গে কথোপকথন করেন। তারা শহরের শিল্পী পরিবেশকে প্রশংসা করে, তবে একই সঙ্গে সরকারের অনুমোদন ছাড়া কাজ করা শিল্পীদের মুখোমুখি সমস্যার ইঙ্গিত দেন।
চিত্রটির মূল থিম হল বন্ধুত্বের শক্তি এবং সৃজনশীলতার প্রতিরোধশক্তি। হানা ও আলি, যাঁরা অবৈধভাবে নাট্য প্রদর্শনী পরিচালনা করেন, তাদের গল্পই ছবির কেন্দ্রীয় কাঠামো গঠন করে। বন্ধুত্বের বন্ধনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই নাট্যচিত্রটি, কিয়ারোস্তামির ‘হোয়্যার ইজ দ্য ফ্রেন্ডস হাউস’ থেকে অনুপ্রাণিত শিরোনাম ব্যবহার করে, ইরানীয় স্বাধীন চলচ্চিত্রের ঐতিহ্যকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
চিত্রের প্রথম দৃশ্যে, হানার সেরা বন্ধু পারি (মাহশাদ বাহরামিনজাদ) রচিত ও পরিচালিত একটি পরীক্ষামূলক নাটক মঞ্চস্থ হয়। নাটকে পারি হানাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করে, যখন সরকারী দমনমূলক কার্যক্রমের ফলে হানা অদৃশ্য হয়ে যায়। তবে পারি ও হানার ঘরের পরবর্তী পার্টিতে, বন্ধুরা একে অপরকে গ্লাসের পানীয় দিয়ে টোস্ট করে, পারির তাহদিগের স্বাদ নিয়ে আলোচনা করে এবং সন্ধ্যায় আরামদায়ক আলাপ চালিয়ে যায়।
চিত্রের কাস্টে মাহশাদ বাহরামিনজাদ, হানা মানা, ফারজাদ কারেন এবং জোহরেহ পিরনিয়া অন্তর্ভুক্ত। পরিচালক-লেখক মারিয়াম আতায়ি ও হোসেইন কেশাভার্জ, উভয়ই ইরানের গোপন শিল্প পরিবেশে কাজ করার সময়ের কঠিন বাস্তবতা থেকে অনুপ্রেরণা গ্রহণ করেছেন। শুটিং প্রক্রিয়ায় তারা ভূগর্ভস্থ স্টুডিও ব্যবহার করে, এবং চূড়ান্ত কপি সীমান্ত পার করে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পৌঁছানোর জন্য গোপনভাবে পরিবহন করা হয়।
স্যান্ডেন্সে চলচ্চিত্রটি প্রথমবারের মতো প্রকাশ পায়, যেখানে দর্শক ও সমালোচক উভয়ই এর বর্ণনামূলক শক্তি ও দৃশ্যমান রঙের প্রশংসা করেন। চলচ্চিত্রের মোট সময়কাল এক ঘণ্টা ছত্রিশ মিনিট, যা সংক্ষিপ্ত হলেও বিষয়বস্তুর গভীরতা বজায় রাখে।
চিত্রের মূল বার্তা হল কঠিন সময়ে শিল্প ও বন্ধুত্বের মাধ্যমে কীভাবে আত্মবিশ্বাস বজায় রাখা যায়। সরকারী সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, চরিত্রগুলো সৃজনশীলতা ও পারস্পরিক সমর্থনের মাধ্যমে নিজেদের প্রকাশের পথ খুঁজে নেয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, চলচ্চিত্রটি শুধুমাত্র ইরানি শিল্পের সংগ্রাম নয়, বরং মানবিক আত্মার অটুটতা প্রদর্শন করে।
উৎসবের সময়, ‘দ্য ফ্রেন্ডস হাউস ইজ হিয়ার’ দর্শকদের মধ্যে উচ্ছ্বাসের সাড়া জাগায়। অনেক দর্শক চলচ্চিত্রের শেষে উঠে দাঁড়িয়ে তালি দেন, যা ইরানের গোপন শিল্পের প্রতি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির সূচক। একই সঙ্গে, চলচ্চিত্রটি ইরানীয় তরুণ শিল্পীদের জন্য একটি অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে বলে ধারণা করা হয়।
চিত্রের সঙ্গীত ও দৃশ্যাবলী তেহরানের গ্রীষ্মের গরম বাতাসের সঙ্গে মিলে, শহরের গলিতে গোপনভাবে চলা শিল্পের চিত্র তুলে ধরে। পারি ও হানার ঘরের আরামদায়ক পরিবেশ, তাহদিগের গন্ধ এবং বন্ধুত্বের হাসি-খুশি, চলচ্চিত্রের মূল আবহকে গঠন করে।
চিত্রের নির্মাণ প্রক্রিয়া ও বিষয়বস্তু ইরানের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। দমনের মুখে শিল্পীরা কীভাবে নিজেদের প্রকাশের উপায় খুঁজে পায়, তা এই কাজের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়। চলচ্চিত্রটি গোপনভাবে শুটিং, সীমান্ত পার করে নিরাপদে পৌঁছানো এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রদর্শনের মাধ্যমে ইরানীয় স্বাধীন চলচ্চিত্রের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
‘দ্য ফ্রেন্ডস হাউস ইজ হিয়ার’ স্যান্ডেন্সে অংশগ্রহণের মাধ্যমে ইরানের গোপন শিল্পের স্বরকে বিশ্ব মঞ্চে শোনাতে সক্ষম হয়েছে। চলচ্চিত্রের সাফল্য ইরানীয় তরুণ শিল্পীদের জন্য একটি উদাহরণ স্থাপন করে, যেখানে বন্ধুত্ব ও সৃজনশীলতা কঠিন সময়ে শক্তির উৎস হয়ে ওঠে।
এই চলচ্চিত্রটি ইরানের বর্তমান সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবেশে শিল্পের ভূমিকা ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে আলোচনার নতুন দিক উন্মোচন করে। বন্ধুত্বের মাধ্যমে সৃষ্টির শক্তি কীভাবে দমনের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে, তা এই কাজের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়। স্যান্ডেন্সে এই চলচ্চিত্রের উপস্থিতি, ইরানীয় স্বাধীন চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎকে উজ্জ্বল করার সম্ভাবনা নির্দেশ করে।



