যুক্তরাজ্যের ভারতীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কন্যা ভ্রূণ গর্ভপাতের সংখ্যা রেকর্ড উচ্চে পৌঁছেছে বলে একটি তদন্তমূলক প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, লিঙ্গের ভিত্তিতে গর্ভপাতের সিদ্ধান্ত নেওয়া মূলত ছেলের প্রতি সামাজিক পছন্দের কারণে হচ্ছে। চার বছরের মধ্যে শত শত গর্ভধারণ কেবল শিশুর লিঙ্গের পার্থক্যের ভিত্তিতে বাতিল করা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের গর্ভপাত সংক্রান্ত আইন স্পষ্টভাবে লিঙ্গের ভিত্তিতে গর্ভপাতকে অবৈধ বলে নির্ধারণ করেছে। তবু এই সীমা অতিক্রমের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা লিঙ্গভিত্তিক গর্ভপাতের সম্ভাবনা নির্দেশ করে।
অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিকসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত সময়কালে ভারতীয় মায়েদের গর্ভধারণে প্রতি ১০০ কন্যা শিশুর তুলনায় গড়ে ১১৮টি ছেলে জন্মেছে। একই সময়ে সব জাতিগোষ্ঠী মিলিয়ে জাতীয় গড় ছিল প্রতি ১০০ কন্যার বিপরীতে ১০৫টি ছেলে। সরকার কর্তৃক নির্ধারিত সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য অনুপাত ১০৭, যা অতিক্রম করা অনুপাতকে উদ্বেগজনক বলে গণ্য করা হয়।
এই পরিসংখ্যানের বিশ্লেষণে দেখা যায়, অনুপাতের এই পার্থক্য লিঙ্গনির্বাচনী গর্ভপাত বা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা পদ্ধতির ইঙ্গিত দিতে পারে। বিশেষ করে, যখন অনুপাত সরকারী সীমা অতিক্রম করে, তখন তা সামাজিক ও পারিবারিক চাপের ফলাফল হতে পারে।
প্রথম ও দ্বিতীয় সন্তানের ক্ষেত্রে ভারতীয় মায়েদের অনুপাত জাতীয় গড়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে তৃতীয় সন্তানের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়। ২০২১-২২ অর্থবছরে তৃতীয় সন্তানের জন্য প্রতি ১০০ কন্যার তুলনায় ১১৪টি ছেলে জন্মেছে; পরের বছর এই অনুপাত ১০৯ এ নেমে আসে, আর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আবার ১১৮ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায় এবং পরবর্তী বছরেও একই মাত্রায় স্থায়ী থাকে।
বিশেষজ্ঞরা ব্যাখ্যা করেন, দুই কন্যা সন্তান গৃহস্থালিতে জন্মানো মা-দের মধ্যে তৃতীয় সন্তান যদি কন্যা হয়, তবে সামাজিক ও পারিবারিক প্রত্যাশা থেকে ছেলেকে সন্তান হিসেবে গ্রহণের চাপ বাড়ে, যা গর্ভপাতের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।
গৃহহিংসা প্রতিরোধে কাজ করা একটি সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা রানি বিলখু উল্লেখ করেন, এই তথ্য স্পষ্টভাবে দেখায় যে পুত্র সন্তানকে কন্যা সন্তানের তুলনায় অধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। স্বামী বা পরিবারের প্রত্যাশা, পাশাপাশি পুরুষ সন্তানকে বংশধর হিসেবে দেখা, অনেক নারীর উপর কন্যা ভ্রূণ গর্ভপাতের চাপ সৃষ্টি করে। তিনি এটিকে শুধুমাত্র গর্ভপাতের বিষয় নয়, লিঙ্গ সমতার গভীর সংকট হিসেবে উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে, একই সময়ে বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি মায়েদের গর্ভধারণে লিঙ্গভিত্তিক কোনো উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়নি; তাদের অনুপাত জাতীয় গড়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি ইঙ্গিত করে যে লিঙ্গ পছন্দের প্রবণতা নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ে সীমাবদ্ধ হতে পারে।
স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী ও নীতি নির্ধারকদের জন্য এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা হিসেবে কাজ করতে পারে। লিঙ্গভিত্তিক গর্ভপাতের ঝুঁকি কমাতে সচেতনতা বৃদ্ধি, পরিবার পরিকল্পনা সেবা ও মানসিক সমর্থন ব্যবস্থা শক্তিশালী করা প্রয়োজন। শেষ পর্যন্ত, সমাজের সকল স্তরে লিঙ্গ সমতা নিশ্চিত করার জন্য কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত, তা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া জরুরি।



