২০২৪ সালের জুলাই মাসের পর থেকে বাংলাদেশ সরকার বহু নতুন কৌশলগত চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। দেশীয় পর্যায়ে একটি প্রজন্মগত পরিবর্তন রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে পুনর্গঠন করছে, যেখানে ন্যায়বিচার ও সমতাপূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি বাড়ছে। ২০২৬ সালে দেশের ‘গ্রাজুয়েশন’ সম্পন্ন হলে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কাঠামো পুনরায় নির্ধারিত হবে এবং তা সঙ্গে সঙ্গে অভ্যন্তরীণ নীতি ও প্রয়োগে সংস্কারের প্রয়োজন তৈরি করবে। পুরনো মানসিকতা ও আচরণ নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে প্রভাবশালী হতে পারবে না।
একই সময়ে, বহিরাগত দিক থেকে জটিল ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোও তীব্রতর হচ্ছে। বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক শক্তিগুলো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোকে কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করে আগ্রহ দেখাচ্ছে। বিশেষ করে ভারত সঙ্গে বিদ্যমান উত্তেজনা সম্প্রসারিত হয়ে পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিবেশকে প্রভাবিত করছে। রোহিঙ্গা সংকটও এখনও সমাধানহীন অবস্থায় রয়েছে, যা পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগের কারণ। ইন্দো‑প্যাসিফিক অঞ্চলে বড় শক্তির প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় বঙ্গোপসাগর ও ভারতীয় মহাসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব বাড়ছে। এই প্রবণতাগুলোকে সঠিকভাবে পরিচালনা করা না হলে জাতীয় পরিচয়, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি হুমকির মুখে পড়তে পারে।
একজন কূটনীতিকের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে কেবলমাত্র কূটনৈতিক চ্যানেলই নয়, ধারণা ও চিত্র পরিচালনায়ও নতুন পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে। অতীতের মানবাধিকার রেকর্ড, রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অস্থিতিশীলতা এবং শাসনব্যবস্থার ঘাটতি দেশের আন্তর্জাতিক সুনামকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তদুপরি, ব্যক্তিত্বের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কূটনৈতিক স্বায়ত্তশাসনকে দুর্বল করেছে। এই সব বিষয় পুনর্বিবেচনা করে কূটনৈতিক নীতি পুনর্গঠন করা জরুরি।
প্রস্তাবিত অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে প্রথমটি হল আন্তর্জাতিক ধারণা পুনর্গঠন। বাংলাদেশ সরকারকে মানবাধিকার সংক্রান্ত অগ্রগতি, স্বচ্ছ নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং শাসনব্যবস্থার সংস্কারকে দৃশ্যমান করতে হবে। এ জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সক্রিয় সংলাপ এবং স্বতন্ত্র পর্যবেক্ষণ মেকানিজমের ব্যবহার কার্যকর হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। ভারত সঙ্গে চলমান উত্তেজনা হ্রাসের জন্য দ্বিপাক্ষিক সংলাপকে ত্বরান্বিত করা, সীমান্ত নিরাপত্তা ও জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিষয়ক সমঝোতা চুক্তি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে, রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে আন্তর্জাতিক সমর্থন ও মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা উচিত, যাতে মানবিক সংকটের দীর্ঘমেয়াদী সমাধান সম্ভব হয়।
তৃতীয় অগ্রাধিকার হল ইন্দো‑প্যাসিফিক অঞ্চলে বড় শক্তির প্রতিযোগিতার প্রভাব মোকাবেলা করা। বাংলাদেশ সরকারকে সমুদ্র নিরাপত্তা, বাণিজ্য রুটের সুরক্ষা এবং জ্বালানি সম্পদ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বহুপাক্ষিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য আঞ্চলিক সংস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান ইত্যাদি প্রধান শক্তির সঙ্গে কূটনৈতিক সমন্বয় বাড়ানো জরুরি।
একই সঙ্গে, দেশীয় অর্থনৈতিক নীতিগুলোকে বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। ২০২৬ সালের ‘গ্রাজুয়েশন’ লক্ষ্য অর্জনের জন্য উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন এবং মানবসম্পদে বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এই অর্থনৈতিক রূপান্তর কূটনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সমন্বয় করে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে সহায়তা করবে।
সারসংক্ষেপে, বাংলাদেশ সরকারকে পুরনো কূটনৈতিক মডেল থেকে বেরিয়ে এসে বহুমাত্রিক কৌশল গ্রহণ করতে হবে। দেশীয় রাজনৈতিক পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক শক্তি গঠনের পরিবর্তন এবং মানবিক সংকটের সমাধানকে একত্রে বিবেচনা করে একটি সমন্বিত নীতি গঠন করা সম্ভব। এ ধরনের রূপান্তরই দেশের স্বার্থ রক্ষা, নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বজায় রাখার মূল চাবিকাঠি হবে।



