শফিকুর রহমান, জামায়াত-এ-ইসলামি দলের আমির, ২৪ জানুয়ারি শনিবার সন্ধ্যায় সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া সরকারি আকবর আলী কলেজ মাঠে অনুষ্ঠিত নির্বাচনী সমাবেশে দলের শাসনকালকে দুর্নীতিমুক্ত বলে দাবি করেন। তিনি অতীতের চারটি শাসনকালকে উদাহরণ দিয়ে বললেন, কোনো দল বুকে হাত দিয়ে দাবি করতে পারে না যে তারা কখনো দুর্নীতি করেনি। একই সময়ে তিনি দলটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেন।
সমাবেশে উপস্থিত ভক্তদের সামনে শফিকুর রহমান দেশের পরিচালনা সুযোগ পেলে দুর্নীতি না হওয়ার নিশ্চয়তা দেন। তিনি উল্লেখ করেন, “অতীতে রাষ্ট্র শাসন করা কোনো দল বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে না, দুর্নীতি করেনি। একটি দল দুর্নীতিতে চারবার চ্যাম্পিয়নও হয়েছে।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি বিরোধী দলের অতীত শাসনকালের দুর্নীতি রেকর্ডকে তীব্রভাবে সমালোচনা করেন।
বেলা সাড়ে তিনটায় সিরাজগঞ্জের ইসলামিয়া সরকারি কলেজে একই দলের দশ দলীয় জোটের আরেকটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এখানে শফিকুর রহমান আবারও নারী নিরাপত্তা ও সামাজিক শৃঙ্খলা নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, “যারা বড় গলায় কথা বলেন, তাদের হাতেই মা-বোনেরা বেশি নির্যাতিত হন। সাধু সাবধান, আমাদের মুখ খুলতে বাধ্য করবেন না। না হলে ভেতরের সবকিছু প্রকাশ করে দেব।” এই মন্তব্যে তিনি নারীর শোষণ ও হিংসার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণের ইঙ্গিত দেন।
শফিকুর রহমানের মতে, জামায়াত-এ-ইসলামি তার সদস্যসংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন কোটি, তবু তার নামে কোনো অভিযোগ নেই। তিনি এই সংখ্যা উল্লেখ করে দলের ব্যাপক সমর্থন ও স্বচ্ছতা জোর দেন। একই সঙ্গে তিনি নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন, “আমরা মা-বোনদের মর্যাদার সঙ্গে ঘরে, চলাচলে ও কর্মস্থলে শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করব।” এই প্রতিশ্রুতি তার সমাবেশে উপস্থিত নারীদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পায়।
দলীয় নীতি সম্পর্কে শফিকুর রহমান স্পষ্ট করে বলেন, “আমরা কারও বিরুদ্ধে লাগালাগি, খোঁচাখুঁচি পছন্দ করি না। কিন্তু আমাদের খোঁচা দিলে, খোঁচা ফিরিয়ে দেওয়া আমাদের ওপর ওয়াজিব।” তিনি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে সংঘর্ষ এড়িয়ে চলার ইচ্ছা প্রকাশ করেন, তবে আক্রমণ হলে সাড়া দেওয়ার প্রস্তুতি উল্লেখ করেন। এই বক্তব্যে তিনি দলীয় নৈতিকতা ও স্ব-সুরক্ষার নীতি তুলে ধরেন।
অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিকেও শফিকুর রহমান কিছু নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি সিরাজগঞ্জে গুঁড়া দুধের কারখানা স্থাপন এবং তাঁতশিল্পসহ অন্যান্য শিল্পখাত পুনরায় চালু করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। এই উদ্যোগগুলোকে তিনি স্থানীয় কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও আঞ্চলিক অর্থনীতির পুনর্জাগরণ হিসেবে উপস্থাপন করেন।
দলীয় নেতৃত্বের এই ঘোষণাগুলোকে বিরোধী দল ও বিশ্লেষকরা প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষক উল্লেখ করেন, জামায়াত-এ-ইসলামি পূর্বে দুর্নীতি সংক্রান্ত অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছে, তাই শফিকুর রহমানের বর্তমান দাবিগুলোকে সতর্কতার সঙ্গে দেখা দরকার। তবে শফিকুর রহমানের সমাবেশে উপস্থিত ভক্তরা তার বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়ে দলীয় নীতি ও প্রতিশ্রুতির প্রতি আস্থা প্রকাশ করেন।
শফিকুর রহমানের এই দুইটি সমাবেশের সময়সূচি ও স্থান নির্বাচনী কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সিরাজগঞ্জের দু’টি প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একসঙ্গে দুইটি সমাবেশের মাধ্যমে তিনি শহরের গুরুত্বপূর্ণ ভোটার গোষ্ঠীর মনোযোগ আকর্ষণ করতে চেয়েছেন। বিশেষ করে নারীদের নিরাপত্তা ও শিল্প পুনরুজ্জীবনের প্রতিশ্রুতি তাকে স্থানীয় ভোটারদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে।
বিপক্ষের কিছু নেতা শফিকুর রহমানের দাবি নিয়ে মন্তব্য করে বলেন, “দুর্নীতি নিয়ে অতীতের শাসনকালের চ্যাম্পিয়নশিপের উল্লেখ করা যথাযথ নয়, কারণ প্রতিটি শাসনকালে বিভিন্ন দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জ থাকে।” তারা দলটির সদস্যসংখ্যা ও অভিযোগমুক্তি সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেন, যদিও কোনো নতুন প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। এই বিতর্ক রাজনৈতিক পরিবেশকে তীব্র করে তুলেছে।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, শফিকুর রহমানের নিরাপত্তা ও শিল্প উন্নয়ন সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি জামায়াত-এ-ইসলামির ভোটার ভিত্তি শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে। অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলোর সমালোচনা ও অতীতের দুর্নীতি রেকর্ডের উল্লেখ ভোটারদের মধ্যে দ্বিধা সৃষ্টি করতে পারে। তাই আসন্ন নির্বাচনে এই বিষয়গুলো কীভাবে প্রভাব ফেলবে তা এখনও অনিশ্চিত।
সারসংক্ষেপে, শফিকুর রহমানের সিরাজগঞ্জে অনুষ্ঠিত দুইটি সমাবেশে তিনি দলের শাসনকালকে দুর্নীতিমুক্ত বলে দাবি করে অতীতের শাসনকালের দুর্নীতি রেকর্ডকে সমালোচনা করেন, নারীর নিরাপত্তা ও শিল্প পুনরুজ্জীবনের প্রতিশ্রুতি দেন, এবং দলীয় সদস্যসংখ্যা ও অভিযোগমুক্তি তুলে ধরে রাজনৈতিক আস্থা বাড়ানোর চেষ্টা করেন। এই বক্তব্যের প্রতি বিরোধী দলের সমালোচনা ও বিশ্লেষকদের সতর্কতা ভবিষ্যৎ নির্বাচনী গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



