চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ) তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে একটি স্পষ্ট ও স্বচ্ছ ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা না থাকা নিয়ে সমালোচনার মুখে। এই ঘাটতি শুধুই প্রশাসনিক ত্রুটি নয়; এটি কৌশলগত ব্যর্থতা হিসেবে দেশের বন্দরকে আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিতে পারে।
বন্দর উন্নয়নের মূল প্রকল্প বেই টার্মিনাল এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপারেটরদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। তবে, মূল্যবান ভূমি সম্পদের ব্যবহার নিয়ে কোনো প্রকাশ্য নীতি না থাকায় সিদ্ধান্তগুলো স্বচ্ছতা ও দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নবিদ্ধ।
আধুনিক বন্দর ব্যবস্থায় ভূমি ব্যবহার সরাসরি ক্ষমতা, দক্ষতা এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের সঙ্গে যুক্ত। তবে, ১৯৯০-এর দশকে কন্টেইনার বাণিজ্যের দ্রুত বৃদ্ধি এবং ২০০০-এর দশকে শিপিং ও লজিস্টিকের সময়সীমা সংকুচিত হওয়ার সময়ে বাংলাদেশ এই গুরুত্বপূর্ণ দিকটি উপেক্ষা করেছে।
প্রধান তটবর্তী জমিগুলো দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিতে, প্রতিযোগিতামূলক টেন্ডার ছাড়াই, অথবা কৌশলগত পুনর্মূল্যায়ন না করে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। ফলে, সম্ভাব্য কাস্টমস-বন্ডেড লজিস্টিক জোন বা রপ্তানি সমর্থনকারী ক্লাস্টার গঠনের বদলে সাধারণ ভাড়া স্থান হিসেবে ব্যবহার হয়, যা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তনশীল বাণিজ্য প্রবণতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এই ঐতিহাসিক পদ্ধতি আজ সিপিএকে কঠিন অবস্থায় ফেলেছে। লালদিয়া এলাকার বর্তমান আলোচনাই এটির স্পষ্ট উদাহরণ। লালদিয়া একটি খালি তটবর্তী সাইট, যেখানে সিপিএ একটি গ্লোবাল অপারেটরের সঙ্গে গ্রিনফিল্ড কনসেশন বিবেচনা করছে।
বিদেশি দক্ষতা ও মূলধন বন্দর ক্ষমতা বাড়াতে ও আধুনিকায়ন করতে প্রয়োজনীয়, তবে সঠিক ভূমি ব্যবহার নীতি ছাড়া এমন চুক্তি দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক ও কার্যকরী ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে, স্পষ্ট নীতি না থাকলে বন্দর ক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লোডিং-অনলোডিং সময় বৃদ্ধি পেতে পারে, যা শিপিং কোম্পানির জন্য অতিরিক্ত খরচের কারণ। ফলে, চট্টগ্রাম বন্দরকে আঞ্চলিক হাব হিসেবে আকর্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক ভূমি বরাদ্দের মাধ্যমে কাস্টমস-বন্ডেড লজিস্টিক পার্ক বা রপ্তানি সমর্থনকারী শিল্প ক্লাস্টার গড়ে তোলা সম্ভব। এধরনের কাঠামো সরবরাহ শৃঙ্খলকে সংক্ষিপ্ত করে, রপ্তানি-আমদানি খরচ কমায় এবং বাণিজ্যিক আয় বৃদ্ধি করে।
যদি সিপিএ দ্রুত একটি সমন্বিত ভূমি ব্যবহার কৌশল প্রণয়ন করে, তবে বিদ্যমান ভাড়া চুক্তিগুলো পুনর্মূল্যায়ন, টেন্ডার প্রক্রিয়া চালু এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা অনুযায়ী নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব হবে। এতে বন্দর পরিচালনায় দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে এবং আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনগুলোর আস্থা জোরদার হবে।
অন্যদিকে, বর্তমান অনিয়মিত পদ্ধতি বন্দরকে অপ্রয়োজনীয় আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে। দীর্ঘমেয়াদী ভাড়া চুক্তি বাজার মূল্যের তুলনায় কম রেটে হতে পারে, যা রাজস্বের হ্রাস ঘটায়। এছাড়া, অপ্রয়োজনীয় জমি ব্যবহার বন্দর সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় স্থান সীমিত করে।
সারসংক্ষেপে, চট্টগ্রাম বন্দরকে আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে ভূমি ব্যবহার নীতি অপরিহার্য। স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতামূলক টেন্ডার এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বন্দর ক্ষমতা, দক্ষতা এবং আর্থিক স্বাস্থ্যের উন্নতি নিশ্চিত করবে।
ভবিষ্যতে, যদি সিপিএ এই ঘাটতি দূর করে একটি সুসংহত ভূমি ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলে, তবে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, বাণিজ্যিক প্রবাহ বৃদ্ধি এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব প্রত্যাশা করা যায়। অন্যথায়, অনিয়মিত সিদ্ধান্তগুলো বন্দরকে প্রতিযোগিতার বাইরে ঠেলে দিতে পারে।



